শুধু ব্যাখ্যা নয়, চাই তথ্য-নির্ভর আগাম ন্যারেটিভ
সংখ্যালঘু ইস্যুতে অপপ্রচার মোকাবেলায় তথ্যভিত্তিক কৌশল জরুরি
বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের অধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রশ্নটি দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক পরিসরে আলোচিত হয়ে আসছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ আলোচনার ঢাল ভিন্ন দিকে মোড় নিয়েছে।
কিছু বিচ্ছিন্ন ও বিতর্কিত ঘটনা, একতরফা ন্যারেটিভ এবং বিদেশে অবস্থানরত নির্দিষ্ট মতলববাজ গোষ্ঠীর অপপ্রচার—সব মিলিয়ে বাংলাদেশকে একটি ‘অসহিষ্ণু রাষ্ট্র’ হিসেবে তুলে ধরার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি ব্রিটিশ পার্লামেন্টের অল-পার্টি পার্লামেন্টারি গ্রুপ ফর বাংলাদেশ (APPG)–এর বিশেষ বৈঠকে বাংলাদেশের সক্রিয় কূটনৈতিক উপস্থিতি একটি তাৎপর্যপূর্ণ পাল্টা উদ্যোগ এবং কূটনৈতিক বিচক্ষণতার প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
পার্লামেন্টে বাংলাদেশের পক্ষে সরব ভূমিকা
লন্ডনে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার আবিদা ইসলাম উক্ত বৈঠকে কেবল কূটনৈতিক সৌজন্য রক্ষা করেননি, বরং সচেতনভাবে দুইটি কৌশলগত বার্তা তুলে ধরেছেন।
প্রথমত, তিনি বাংলাদেশের অগ্রগতি, ধর্মীয় সহনশীলতা ও গণতান্ত্রিক অঙ্গীকার তুলে ধরে বলেছেন—রাষ্ট্রীয় নীতিমালায় সংখ্যালঘুদের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে এবং সহিংসতার ঘটনাগুলোর অধিকাংশই স্থানীয় বিরোধ বা গুজব-নির্ভর উত্তেজনা থেকে সৃষ্ট।
দ্বিতীয়ত, তিনি নির্বিচার অস্বীকার নয় বরং নিরপেক্ষ তদন্তের প্রয়োজনীয়তা মেনে নিয়ে একটি খোলামেলা ও স্বচ্ছ বার্তা দিয়েছেন আন্তর্জাতিক মহলের কাছে—যা একান্তই সময়োপযোগী ও কূটনৈতিক বিচক্ষণতার পরিচায়ক।
আন্তর্জাতিক অপপ্রচারের ভিত্তি ও এর বিপরীতে বাস্তবতা
বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার কিছু ঘটনা সত্য হলেও সেগুলোর প্রেক্ষাপট প্রায়ই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বিকৃতভাবে উপস্থাপিত হয়। স্থানীয় জমিজমা, প্রেমঘটিত বিরোধ, সামাজিক হিংসা বা রাজনৈতিক উত্তেজনা—এসব প্রেক্ষাপট উপেক্ষা করে অনেক সময় এসব ঘটনাকে রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন বা পরিকল্পিত সাম্প্রদায়িকতা হিসেবে তুলে ধরা হয়। এ প্রবণতা কেবল সত্যকে আড়াল করে না, বরং রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক ইমেজ ক্ষুণ্ন করে।
ব্রিটিশ এমপিদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন—একটি কৌশলগত সুযোগ
APPG বৈঠকে কয়েকজন ব্রিটিশ এমপি যে সরব অংশগ্রহণ করেছেন, সেটি একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। তারা একপাক্ষিক তথ্য-নির্ভর আলোচনার পরিবর্তে বাস্তবতা অনুধাবনে আগ্রহী হয়েছেন। এ পরিবর্তিত মানসিকতা থেকেই ভবিষ্যতে বাংলাদেশ সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক আলোচনায় একটি ‘কাউন্টার ন্যারেটিভ’ গড়ে তোলার ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে, যা বহুপাক্ষিক সমর্থন জোগাড়ে সহায়ক হবে।
শুধু ব্যাখ্যা নয়, চাই তথ্য-নির্ভর আগাম কৌশল
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে হাইকমিশনের ব্যাখ্যামূলক বক্তব্য অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে প্রশ্ন হচ্ছে—এটিই কি যথেষ্ট? একবিংশ শতাব্দীর ভূরাজনীতিতে ‘Public Diplomacy’ বা ‘জনগণের কূটনীতি’ একটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হয়ে উঠেছে। সেখানে শুধু সেমিনারে বক্তব্য দিয়ে চলা নয়, বরং দরকার—
- বিশ্বমানের তথ্যচিত্র, প্রামাণ্য প্রতিবেদন ও ন্যারেটিভ-বেইজড ভিডিও কনটেন্ট নির্মাণ,
- আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বাংলাদেশপন্থী গবেষক ও চিন্তাবিদদের লেখা প্রকাশে সহযোগিতা,
- প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে রাষ্ট্রপক্ষের বার্তা পৌঁছে দেয়া,
- এবং সর্বোপরি—তথ্যযুদ্ধের একটি সংগঠিত ও সক্রিয় রূপরেখা তৈরি করা।
রোহিঙ্গা সংকট ও মানবাধিকার নিয়ে কাঠামোগত বার্তা প্রয়োজন
রোহিঙ্গা সংকট, নাগরিক অধিকার, আন্দোলন দমন ইত্যাদি বিষয়েও হাইকমিশনারের পক্ষ থেকে কিছু সুসংহত বক্তব্য এসেছে। তবে এগুলোর পেছনে থাকছে না লং-টার্ম কৌশলগত প্ল্যান। বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতির বাস্তবচিত্র ও রোহিঙ্গা ইস্যুতে দেশের নেয়া ইতিবাচক উদ্যোগগুলো গবেষণা ও ভিজ্যুয়াল প্রেজেন্টেশন দিয়ে তুলে ধরার ব্যবস্থা গড়ে না তুললে, আন্তর্জাতিক পরিসরে ঢাল তৈরি করা কঠিন হবে।
আরও পড়ুন <<>> রাজনীতির ফিনিক্স পাখি খালেদা জিয়া
প্রবাসে রাষ্ট্রীয় সেবা ও 'ডায়াসপোরা ডিপ্লোমেসি'
বর্তমানে ইউকে-সহ ইউরোপজুড়ে প্রবাসী বাংলাদেশির সংখ্যা প্রায় ৭ লাখের বেশি। এ বিশাল জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক গড়ে না তুললে ‘ডায়াসপোরা ডিপ্লোমেসি’ কেবল নীতিগত শব্দ হয়েই থেকে যাবে।
প্রয়োজন—
- দূতাবাসের সেবা সহজ ও ডিজিটাল করা,
- রাষ্ট্রপক্ষ থেকে বিশ্বমানের তথ্যচিত্র, প্রামাণ্যচিত্র ও কনটেন্ট তৈরি করা;
- গবেষণানির্ভর প্রতিবেদন, বিশেষত আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় উপস্থাপনযোগ্য তথ্যভিত্তিক লেখা ছড়িয়ে দেয়া;
- প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন এবং ‘ডায়াসপোরা ডিপ্লোমেসি’কে কেবল বক্তৃতায় নয়, বাস্তব কাজে রূপান্তর করা;
- রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তথ্যযুদ্ধে একটি সংগঠিত, সক্রিয় রূপরেখা তৈরি করা।
- নিয়মিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, মুক্ত আলোচনার ফোরাম আয়োজন,
- এবং সর্বোপরি প্রবাসী তরুণ প্রজন্মকে রাষ্ট্রীয় ন্যারেটিভের অংশীদার করা।
ব্রিটিশ পার্লামেন্টে বাংলাদেশের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। তবে এটি যেনো এককালীন ও প্রতিক্রিয়ামূলক প্রচেষ্টা না হয়ে ওঠে। বরং রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একটি সুগঠিত ও দীর্ঘমেয়াদী কৌশলের অংশ হওয়া দরকার।
বিশ্বব্যাপী তথ্য-নির্ভর মতাদর্শিক লড়াইয়ে পিছিয়ে পড়লে রাষ্ট্রীয় ইমেজের পুঁজিই ক্ষয়ে যাবে। তাই এখন সময়—তথ্য, প্রযুক্তি ও মানুষকে একত্র করে একবিংশ শতাব্দীর ‘ইনফরমেশন ডিপ্লোমেসি’র রূপরেখা নির্মাণের।
১৬ মে ২০২৫
সম্পাদক




























