Sobar Desh | সবার দেশ আবু ইউসুফ


প্রকাশিত: ০০:১২, ১৩ জুন ২০২৫

আপডেট: ০০:২০, ১৩ জুন ২০২৫

ইতিহাসের মোড় ঘোরানোর এক অনন্য ক্ষণ

‘লন্ডন বৈঠক’ সফল হোক

‘লন্ডন বৈঠক’ সফল হোক
ছবি: সবার দেশ

বাংলাদেশ আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। পেছনে চূর্ণবিচূর্ণ দেড় দশক, যেখানে গণতন্ত্রের নামে শাসন, নির্বাচনের নামে প্রহসন, এবং স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের ওপর রাষ্ট্রীয় জুলুম চলেছে এক নিপীড়ক কাঠামোর মাধ্যমে। সে কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, সেই কল্পনাতীত পরিসর অতিক্রম করে দেশের রাজনৈতিক আকাশে দেখা দেয় এক নতুন ভোর। এবং সে ভোরের আলোয় দেশের দায়িত্ব তুলে নেন শান্তির প্রতীক, নোবেল বিজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

এ বাংলাদেশ আর আগের বাংলাদেশ নেই। পঁচে যাওয়া গণতন্ত্র, কারাগারে পরিণত হওয়া রাজনীতি, এবং রক্তে রঞ্জিত ম্যান্ডেটহীন রাষ্ট্রশক্তি আজ মৃতপ্রায়। এ মৃত্যুপর্বের সূচনা হয়েছে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট – যেদিন শেখ হাসিনার একচ্ছত্র শাসনের অবসান হয়। কিন্তু অবসান মানেই মুক্তি নয়। স্বৈরশাসকের পতনের পর আসে নেতৃত্বহীন অন্ধকার, আসে দ্বন্দ্ব, ষড়যন্ত্র আর জাতির ভাগ্য নিয়ে বিদেশি খেলোয়াড়দের টানাহেঁচড়া। ঠিক সে পটভূমিতে দাঁড়িয়ে আজ বিশ্বের দৃষ্টি নিবদ্ধ লন্ডনের এক ঘরের দরজার ওপরে – যেখানে মুখোমুখি হচ্ছেন দুই যুগের দুই মুখপাত্র: ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং তারেক রহমান।

এ বৈঠক কি এক যুগান্তকারী পুনর্জন্ম, না কি চূড়ান্ত বিভাজনের সুর বাজাবে – এ প্রশ্নের উত্তরেই নিহিত বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ।

জাতির শত্রুদের বিরুদ্ধে আপসহীন প্রতিরোধের ইতিহাসের নায়ক: ড. ইউনূস

প্রায় এক দশক ধরে যার নামে অপপ্রচার, মিথ্যাচার, রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন চালানো হয়েছে, সে ড. ইউনূসই যখন হাসিনা-পরবর্তী অন্তর্বর্তী ক্ষমতায় এসে দাঁড়ালেন, তখন গোটা জাতি বুঝে গেলো – এ মানুষটি কেবল একজন নোবেলজয়ী নন, তিনি জাতির শেষ আশ্রয়। তার বয়স ৮৪, কিন্তু প্রত্যয়ের বয়স নেই। ড. ইউনূসকেই জনগণ আকড়ে ধরেছে শেষ আশার বাতিঘর হিসেবে। তাকে কেন্দ্র করে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন হলেও, তা স্থিতিশীল নয় – কেনোনা আন্দোলন-উত্তর অনৈক্য ও আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এ সরকারকে করে তুলেছে নাজুক। তার ওপর ভারতের অব্যাহত নজরদারি, পশ্চিমা কূটনীতির দ্ব্যর্থতা এবং অভ্যন্তরীণ লবির চাপ – সব মিলিয়ে ইউনূস সরকারকে দাঁড় করিয়েছে এক তীব্র রাজনৈতিক পরীক্ষার মুখে। ভারত-চালিত সাম্রাজ্যবাদী শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানো, পশ্চিমাদের দ্বিমুখী কূটনীতির ফাঁক গলে দেশকে বাঁচিয়ে রাখা – এসব শুধু একজন দেশপ্রেমিক রাষ্ট্রনায়কের পক্ষেই সম্ভব।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, এ সংগ্রামে তিনি কতটা সফল? ব্যর্থ রাজনৈতিক দলগুলোর বিরোধিতা, আন্দোলনের শরিকদের বিশ্বাসঘাতকতা, এবং নেতৃত্বের সংকট ড. ইউনূসকে ঠেলে দিয়েছে এক অনাকাঙ্ক্ষিত কোণঠাসা অবস্থানে। ঐক্যবদ্ধ জুলাই আন্দোলনের শরীক শক্তিগুলোর অনৈক্য প্রকট হয়েছে এ ৯ মাসে। এ ব্যর্থতার দায় কার দায় কতটা, সে প্রশ্ন আজ আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়েছে জনগণের অন্তর থেকে অন্তর্জালে।

ঐক্যের প্রশ্নে ব্যর্থ রাজনৈতিক শক্তিগুলো

২০২৪ সালের জুলাইয়ে যেভাবে সমগ্র জাতি এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক ঐক্যের মাধ্যমে রাস্তায় নেমেছিলো, তা যুগান্তকারী ইতিহাসের অংশ। কিন্তু মাত্র ৯ মাসেই সে ঐক্য ভেঙে পড়ে বিভেদের দেয়ালে। বিএনপি, নাগরিক ঐক্য, ১২ দল, ছাত্র-জনতার বিকল্প শক্তি এবং বিভিন্ন বাম ও ইসলামপন্থী প্ল্যাটফর্মগুলোর মধ্যে দেখা যায় পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস, নেতৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ – একটি সামগ্রিক রাজনৈতিক রোডম্যাপের অভাব।

যেখানে জুলাই সনদ, আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধকরণ, নির্বাচনী রোডম্যাপ, সেনা প্রধানের ভূমিকা, শেখ হাসিনাকে বিচারের কাঠগড়ায় দাড় করানো, এমনকি জুলাই আন্দোলনে নিহতদের ক্ষতিপূরণ ও আহতদের পুনর্বাসন ইস্যুগুলোতে একটি অভিন্ন অবস্থান নেয়ার কথা ছিলো, সেখানে হয়েছে উল্টোটা। জনগণ হতাশ হয়েছে, রাষ্ট্র আবারও অনিশ্চয়তার দোলনায় দুলেছে।

তারেক রহমান: নির্বাসনের বালুকণায় সময় জমে থাকা এক বিদ্রোহ

তারেক রহমান, এক সময়ের প্রতিশ্রুতিশীল রাজনীতিক, পরবর্তীতে সেনা-পুলিশ-মাফিয়া হাসিনার ষড়যন্ত্রে দেশান্তরিত নেতা। তাকে নিয়ে বিতর্ক আছে – যেমনটি থাকা উচিত একজন প্রকৃত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে ঘিরে। কিন্তু এও সত্য, বিএনপি আজও তাকেই কেন্দ্র করে টিকে আছে। তার রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, সংগঠন পুনর্গঠনের দক্ষতা এবং আন্দোলনের সময়কালে ভার্চুয়াল নেতৃত্ব – সবকিছুই তাকে অস্বীকার করার জায়গা সংকুচিত করেছে।

কিন্তু লন্ডনে ইউনূস-তারেক বৈঠকের পূর্বে একটা বিষয় পরিষ্কার ছিলো না – এ দুই শীর্ষ ব্যক্তিত্ব কি আদৌ এক ছাতার নিচে আসতে পারবেন? কেউ নেতৃত্ব ছাড়বেন? কেউ সম্মানজনক সমঝোতার দিকে এগোবেন? এ বৈঠক সে প্রশ্নেরই উত্তর দেবে।

লন্ডন বৈঠক: আশার পুনর্জাগরণ

এমন পটভূমিতে, ড. ইউনূসের এ লন্ডন সফর এবং দীর্ঘদিন নির্বাসনে থাকা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সরাসরি বৈঠকের সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে সময়োচিত, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও রাজনৈতিক ইতিহাসে এক টার্নিং পয়েন্ট হয়ে উঠতে পারে। এ বৈঠক কেবল দুই ব্যক্তির মিলন নয়, বরং এটি হতে যাচ্ছে আন্দোলন-উত্তর বাংলাদেশের ভবিষ্যতের রূপরেখা নির্ধারণের এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। 

আজকের এ বৈঠক যদি ব্যর্থ হয়, তাহলে শুধু একটি আলোচনা ভেস্তে যাবে না – বরং একটি সম্ভাব্য জাতীয় ঐক্য, একটি অন্তর্বর্তী সরকারের টেকসই রূপরেখা, একটি মুক্ত নির্বাচনের ভিত্তি – সবকিছুই পুঞ্জীভূত হতাশার গহ্বরে হারিয়ে যাবে। তখন ফের ক্ষমতার শূন্যতা কাজে লাগাবে চক্রান্তকারী শক্তি, ভারতীয় গোয়েন্দা কাঠামো, এবং পুরনো রাষ্ট্রযন্ত্রের দালালেরা।

কী প্রত্যাশা করা হচ্ছে এ বৈঠক থেকে?

  • একটি সুস্পষ্ট জাতীয় ঐক্যের ঘোষণা – যাতে অন্তর্বর্তী সরকারকে রাজনৈতিক ও নৈতিক ভিত্তি দেয়া যায়।
  • আন্তঃদলীয় সমঝোতায় একটি জাতীয় সরকার গঠন
  • আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করে গণবিচারের আওতায় আনা
  • নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট সময়সীমা ও গ্রহণযোগ্য রোডম্যাপ ঘোষণা
  • আন্দোলনে নিহতদের পরিবারকে পুনর্বাসন ও সম্মাননা
  • রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থা পুনর্গঠন
  • বিচার বিভাগ ও নির্বাচন কমিশনের সম্পূর্ণ সংস্কার
  • আন্তর্জাতিক সমর্থন অর্জনের রূপরেখা – বিশেষ করে যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাতিসংঘের সঙ্গে সমন্বয়।

রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে জনগণের শেষ হুঁশিয়ারি

এখন জনগণ আর আগের মতো ভোঁতা নয়। তারা লড়েছে, মরেছে, হারিয়েছে। তারা পেরেছে শেখ হাসিনার মতো একনায়কতন্ত্রকে নামাতে। কিন্তু এখন তারা দেখছে – যারা তাদের রক্তের বিনিময়ে ক্ষমতায় আসছে, তারা নিজেদের পদের ভাগবাটোয়ারা নিয়েই ব্যস্ত।

আরও পড়ুন <<>> দলীয় কর্মীদের রাজনৈতিক অপরাধের দায় কার?

এ পরিস্থিতিতে যদি লন্ডন বৈঠকে নেতৃত্বের অন্ধ লোভ, দলগত অহমিকা, কিংবা পুরনো ষড়যন্ত্র ঢুকে পড়ে – তাহলে দেশের ভবিষ্যৎ আরও ভয়াবহ হবে। জনগণ তখন নিজেই হাতে তুলে নেবে পরবর্তী সিদ্ধান্ত, আর ইতিহাস একবার ক্ষমা করলেও বারবার করে না।

আন্তর্জাতিক শক্তি: তাদের আগ্রহ কিন্তু শর্তসাপেক্ষ

যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, চীন, এমনকি সৌদি আরব – সবাই চোখ রেখেছে এ বৈঠকে। ভারত জানে, এ বৈঠক সফল হলে তাদের কৌশলগত আধিপত্যে ধস নামবে। তাই তারা চায় – আলোচনায় ভাঙন হোক, বিভাজন থাকুক।

কিন্তু লন্ডন আজ শুধু ভূগোল নয়, এ এক কূটনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধক্ষেত্র – যেখানে এ দুই নেতা যদি একসঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে হাঁটতে পারেন, তাহলে পুরো খেলাই বদলে যাবে।

সফল হোক লন্ডন বৈঠক

১৮ কোটি মানুষের ৩৬ কোটি চোখ এখন লন্ডনের দিকে। রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, দলগত অহংবোধ ও নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা নয় – বরং জনগণের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে যদি ড. ইউনূস ও তারেক রহমান জাতির বৃহত্তর স্বার্থে ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেন, তাহলে তা হবে নতুন এক ইতিহাসের সূচনা।

ড. ইউনূস ও তারেক রহমানের মধ্যে যেকোনো একটির আত্মত্যাগ বা উচ্চতা না থাকলে এ বৈঠক সফল হবে না। যদি তারা ব্যক্তি নয়, রাষ্ট্রের স্বার্থে এগিয়ে আসেন – তাহলে আগামী দিনের বাংলাদেশ তৈরি হবে একটি গণতান্ত্রিক সংবিধান, ন্যায়বিচার, আইনের শাসন, এবং আত্মমর্যাদাশীল পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তিতে।

তারা যদি ব্যর্থ হন – তাহলে এ ব্যর্থতার দায় নিয়ে আরেকবার রাজপথে নামবে মানুষ। তখন আর সভা নয়, বৈঠক নয় – হবে গণআদালত, গণচেতনার চূড়ান্ত রায়।

এ বৈঠক যেন ব্যর্থ না হয়। যেন এটি হয়ে ওঠে সে ভিত্তিপ্রস্তর, যার ওপর দাঁড়িয়ে আগামী প্রজন্ম এক মর্যাদাপূর্ণ, গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশের কথা বলবে।

তাই বলি—লন্ডন বৈঠক সফল হোক। ইতিহাস যেনো গর্বের সঙ্গে তা স্মরণ করে। এ বৈঠক হোক আত্মবিসর্জনের মঞ্চ, আত্মস্বার্থ নয়, রাষ্ট্রস্বার্থের নামে লেখা হোক নতুন ইতিহাস। বাংলাদেশ বাঁচুক, নেতৃত্ব জাগুক।

১৩ জুন ২০২৫
সম্পাদক

শীর্ষ সংবাদ:

পাঁচ অস্ত্রসহ গ্রেফতার লিটন গাজী সম্পর্কে সব জানালো পুলিশ সুপার
আনসার ভিডিপি ব্যাংকের ৯ কোটি টাকা আত্মসাৎ, ব্যবস্থাপক গ্রেফতার
লালমনিরহাটে স্বামী হত্যা মামলায় স্ত্রী ও পরকীয়া প্রেমিকের যাবজ্জীবন
ভোলাহাটে বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে কলেজ শিক্ষকের মৃত্যু
সৌদি আরবে প্রবাসী বাংলাদেশিরা দালাল চক্রের খপ্পরে
বাংলাদেশ সীমান্তে পঁচছে ৩০ হাজার টন ভারতীয় পেঁয়াজ
সুদের টাকার জন্য নোয়াখালীতে ব্যবসায়ীকে পিটিয়ে হত্যা, গ্রেফতার-১
ইমরান খান বেঁচে আছেন, দেশ ছাড়তে চাপ: পিটিআই
হাসিনা-রেহানা-টিউলিপের প্লট দুর্নীতি মামলার রায় আজ
শুরু হলো বিজয়ের মাস
বিডিআর হত্যাকাণ্ডে ভারত জড়িত
খালেদা জিয়ার খোঁজ নিতে হাসপাতালে জামায়াত সেক্রেটারি
স্কুল ভর্তির লটারি ১১ ডিসেম্বর
বিডিআরকে দুর্বল করে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখাতেই পিলখানা হত্যাকাণ্ড
ছয় উপসচিবের দফতর পরিবর্তন