ইরানের হামলায় নাজেহাল ইসরায়েল, বাড়ছে দেশত্যাগ
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতে ইরানের পাল্টা হামলার মুখে ক্রমেই চাপে পড়ছে ইসরায়েল। যুদ্ধের প্রভাব শুধু সামরিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই—অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা, অর্থনৈতিক চাপ, বিক্ষোভ এবং দেশত্যাগের প্রবণতা—সব মিলিয়ে এক জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি তেল আবিব।
১৯৪৮ সালে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার পর থেকে বহুবার যুদ্ধ-সংঘাতে জড়ালেও অভ্যন্তরীণ ভাঙন বা দেশত্যাগের এমন প্রবণতা খুব একটা দেখা যায়নি। তবে ২০২৩ সালে হামাস-এর বড় ধরনের হামলার পর থেকে ইসরায়েলি সমাজে নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্ক বাড়তে থাকে।
এরপর দীর্ঘ সময় ধরে ফিলিস্তিনে সামরিক অভিযান চালাতে গিয়ে উল্টো চাপের মুখে পড়ে ইসরায়েল। বিশ্লেষকদের মতে, এ পরিস্থিতি ‘ব্যাকফায়ার’ করে এখন অভ্যন্তরীণ অসন্তোষে রূপ নিয়েছে। সীমান্ত এলাকা ও বিমানবন্দরগুলোতে দেশ ছাড়তে আগ্রহীদের ভিড় বাড়ছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রকে সঙ্গে নিয়ে ইরান-এ সামরিক অভিযান শুরু করার পর এ অসন্তোষ আরও বেড়েছে। যদিও শুরুতে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ইরানের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করা হয়—যেখানে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি-সহ অনেক উচ্চপদস্থ সামরিক ও সরকারি কর্মকর্তার মৃত্যুর খবর আসে—তবুও ইরান পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
ইরানে সাম্প্রতিক এক ঘটনায় মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার পর সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া কিছু ভিডিওতে দেখা যায়, স্থানীয় সাধারণ মানুষ, এমনকি উপজাতি নারীরাও অস্ত্র হাতে পাইলট খুঁজতে নামছেন। এতে ইরানের অভ্যন্তরে জনসমর্থনের একটি চিত্র উঠে এসেছে।
অন্যদিকে ইসরায়েলে দৃশ্যপট ভিন্ন। ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের লক্ষ্যে অভিযান শুরু হলেও উল্টো দেশটির ভেতরেই সরকারবিরোধী আন্দোলন জোরদার হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু-এর পদত্যাগ ও যুদ্ধ বন্ধের দাবিতে রাস্তায় নামছেন সাধারণ মানুষ।
শনিবার (৪ এপ্রিল) তেল আবিবে শত শত বিক্ষোভকারী ‘বোমা নয়—আলোচনা চাই’ স্লোগান তুলে সমাবেশ করেন। ইসরায়েলি-ফিলিস্তিনি তৃণমূল সংগঠন স্ট্যান্ডিং টুগেদার-এর সহ-পরিচালক অ্যালন-লি গ্রিন বলেন, তারা ইরান, লেবানন ও গাজায় চলমান যুদ্ধ বন্ধ এবং পশ্চিম তীরে সহিংসতা থামানোর দাবিতে মাঠে নেমেছেন।
এর আগে ২৮ মার্চও তেল আবিব, হাইফা ও জেরুজালেমে হাজারো মানুষ একই দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন।
বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ইসরাইলিদের রাস্তায় নামার পেছনে বড় কারণ হয়ে উঠেছে অর্থনৈতিক চাপ। যুদ্ধের কারণে জ্বালানি, খাদ্য ও পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় আয় কমছে, অন্যদিকে জীবনযাত্রার খরচ বাড়ছে। ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কায় দীর্ঘ সময় বাঙ্কারে থাকতে হচ্ছে, যা স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করছে।
একই সঙ্গে যুদ্ধ চালাতে গিয়ে প্রতি সপ্তাহে বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে, যা অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করছে এবং মুদ্রার মান কমিয়ে দিচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে দেশত্যাগের প্রবণতাও বাড়ছে। টিআরটি ওয়ার্ল্ড-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩-২৪ সময়ে প্রায় এক লাখ ইসরায়েলি দেশ ছেড়েছেন। তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়-এর এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। নিরাপত্তাহীনতা ও অর্থনৈতিক চাপে বিশেষ করে উচ্চ দক্ষ পেশাজীবীরা দেশ ছাড়ছেন।
গবেষকরা সতর্ক করেছেন, রাজনৈতিক বা নিরাপত্তাজনিত নতুন ধাক্কা এলে এ দেশত্যাগের হার আরও বেড়ে যেতে পারে।
বর্তমানে মিশর সীমান্ত ইসরায়েলিদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বেরিয়ে যাওয়ার পথে পরিণত হয়েছে। অতীতে যেখানে ফিলিস্তিনিরা পালিয়ে যেতেন, এখন সেখানে উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। ইসরায়েলের পর্যটন মন্ত্রণালয় ২ মার্চ থেকে তাবা সীমান্তে যাতায়াতের জন্য শাটল সার্ভিস চালু করেছে, যা নাগরিকদের দেশ ছাড়তে সহায়তা করছে।
তবে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ ভিন্ন দাবি করছে। রয়টার্স-এর এক প্রতিবেদনে দেশটির ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ইরানে অভিযান শুরুর পর প্রায় ২০ হাজার ইহুদি ইসরাইলে ফিরে এসেছে।
সব মিলিয়ে, ইরানের পাল্টা হামলা ও দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ইসরায়েলের ভেতরে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করেছে—যেখানে যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সবার দেশ/কেএম




























