নিউ আরবের বিশ্লেষণ
প্রক্সি বাহিনী দিয়ে গাজা নিয়ন্ত্রণের কৌশল ইসরায়েলের
গাজা উপত্যকায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হওয়ার পরও অঞ্চলটিতে স্থায়ী অস্থিরতা বজায় রাখতে নতুন কৌশল নিয়েছে ইসরায়েল। দেশটি এখন গোপনে সশস্ত্র প্রক্সি বাহিনী গড়ে গাজায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে—যা ১৯৮০-এর দশকে লেবাননে ব্যবহৃত পুরনো রণকৌশলেরই পুনরাবৃত্তি।
ইসরায়েলি মদদে গঠিত ‘আবু শাবাব গোষ্ঠী’
যুদ্ধবিরতির শুরুতেই আলোচনায় আসে ইয়াসির আবু শাবাবের নেতৃত্বাধীন সশস্ত্র গোষ্ঠী। ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থার প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় গঠিত এ গ্রুপটি প্রথমদিকে ইসরায়েলের হয়ে কাজ করলেও, পরে তাদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দেয় তেলআবিব। কারণ, আবু শাবাব ও তার সহযোগীরা গাজায় পরিকল্পিত লুটপাট, হত্যাকাণ্ড এবং ইসরায়েলি বাহিনীর সহযোগিতার অভিযোগে আন্তর্জাতিক বিচার এড়াতে সুরক্ষা দাবি করে বসেন।
তবে পরিস্থিতি পাল্টে যায় যখন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু মার্কিন প্রস্তাবিত শান্তিচুক্তির ধারা সংশোধন করে গাজার ৫৮ শতাংশ ভূমি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার সিদ্ধান্ত নেন। এরপরই ইসরায়েল আবারও আবু শাবাব গোষ্ঠীকে অর্থ ও অস্ত্র সহায়তা দিতে শুরু করে। বর্তমানে এ গ্রুপটি গাজায় গুপ্তহত্যা, অপহরণ, গুপ্তচরবৃত্তি এবং ‘হিট অ্যান্ড রান’ হামলা চালিয়ে ইসরায়েলি স্বার্থ রক্ষা করছে।
গাজায় একাধিক প্রক্সি গোষ্ঠী
নিউ আরবের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আবু শাবাবের মতো আরও কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠী গড়ে তুলেছে ইসরায়েল। রাফায় আবু শাবাব, খান ইউনুসে হুসাম আল-আসতাল, বাইত লাহিয়ায় আশরাফ আল-মানসি এবং পূর্ব গাজায় রামি হালস নেতৃত্ব দিচ্ছেন এসব বাহিনীগুলোর। গাজার জনশূন্য ৫৮ শতাংশ ভূখণ্ড ইসরায়েলের হয়ে ‘নজরদারি’ ও ‘নিরাপত্তা রক্ষার’ নামে তারা পাহারা দিচ্ছে।
গোয়েন্দা সংস্থার পরিকল্পিত নিয়োগ
ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেত এবং প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) ২০২৪ সালের মে মাস থেকেই গাজায় এ প্রক্সি বাহিনী গঠনের কাজ শুরু করে। ৭ অক্টোবরের হামলার পর কারাগার থেকে পালিয়ে আসা অনেক অপরাধীকে এ গ্রুপগুলোতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অর্থ, অস্ত্র, গাড়ি, বিলাসবহুল জীবনযাপন ও নিরাপত্তার প্রলোভন দেখিয়ে তাদের enlist করা হয়।
চারটি উদ্দেশ্যে এ বাহিনীগুলোকে ব্যবহার করছে ইসরায়েল
প্রতিবেদনে বলা হয়, এ গোষ্ঠীগুলোকে চারটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে ব্যবহার করছে ইসরায়েল—
- গাজার ৯০ শতাংশ আন্তর্জাতিক সাহায্য লুট করে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করা,
- সমাজে বিভাজন ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা,
- রাজনৈতিক নেতৃত্ব দুর্বল করা,
- প্রয়োজনে সরাসরি ইসরায়েলের পক্ষে যুদ্ধ করা।
এর মাধ্যমে ইসরায়েল গাজায় মানবিক বিপর্যয় তৈরি করে আন্তর্জাতিক চাপ কমিয়ে রাখতে চায়।
পুরনো কৌশলের পুনরাবৃত্তি
বিশ্লেষকরা মনে করেন, গাজায় এ প্রক্সি বাহিনী গঠনের কৌশলটি ১৯৮২ সালের লেবানন যুদ্ধের সময় ইসরায়েলের গড়া ‘সাউথ লেবানন আর্মি (এসএলএ)’–র পুনরাবৃত্তি। সে বাহিনী সাবরা ও শাতিলা শরণার্থী শিবিরে সাড়ে তিন হাজার ফিলিস্তিনি হত্যায় জড়িত ছিলো। ইসরায়েল দক্ষিণ লেবানন থেকে সরে যাওয়ার পর এসএলএ ভেঙে পড়ে, এর সদস্যরা কেউ ইসরায়েলে পালায়, কেউ বিচারের মুখোমুখি হয়।
অস্ত্র সরবরাহ ও ব্যর্থতা
গাজায় অবৈধ অস্ত্র ঢুকতে ইসরাইল নিজেই সুযোগ দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কখনও সরাসরি, কখনও পরোক্ষভাবে এসব গ্রুপকে অস্ত্র দিচ্ছে তারা। তবে গত জুনে ইসরায়েলি পত্রিকা ‘ইয়েদিওত আহরোনোথ’ স্বীকার করেছে—আবু শাবাব মিলিশিয়ার ওপর বিনিয়োগে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ, এসব গোষ্ঠী এখনও ছোট আকারে সীমাবদ্ধ এবং অনেক সদস্য একযোগে হামাস ও ইসরায়েল দুই পক্ষের হয়েই কাজ করছে, অর্থাৎ ডাবল এজেন্ট হিসেবে।
ফলে গাজা নিয়ন্ত্রণে ইসরাইলের এ নতুন প্রক্সি কৌশল দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকবে কি না, তা নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠেছে মধ্যপ্রাচ্যের বিশ্লেষকদের মধ্যে।
সবার দেশ/কেএম




























