গাজায় যুদ্ধবিরতি: ক্লান্ত উপত্যকায় আনন্দাশ্রু, বাঁধভাঙা উল্লাস
দুই বছরের ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর অবশেষে গাজায় থেমেছে যুদ্ধের গর্জন। বৃহস্পতিবার (৯ অক্টোবর) রাতে এক অভাবনীয় শান্তি চুক্তিতে ইসরায়েল ও হামাসের সম্মতির খবর প্রকাশ পেতেই যুদ্ধবিধ্বস্ত উপত্যকাজুড়ে বয়ে যায় উল্লাসের ঝড়। আকাশে ছুটে যায় উচ্ছ্বাসের গুলি, আর রাস্তায় রাস্তায় ফেটে পড়ে ‘আল্লাহু আকবর’ ধ্বনি। বহুদিন পর রক্তে রাঙা এ ভূখণ্ডে ফিরে এসেছে স্বস্তির অশ্রু, তবে তার সঙ্গে জুড়ে আছে গভীর অবিশ্বাস—এ শান্তি কতদিন স্থায়ী হবে, তা কেউ জানে না।
আল মাওয়াসি উপকূলীয় এলাকায় মানুষ দলবদ্ধভাবে নামাজ পড়ে কেঁদেছেন আনন্দে। আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনি আহমেদ শেহাইবা বলেন, এ এক বড় দিন, অপার আনন্দের দিন।
খান ইউনিসের আয়মান সাবের সংবাদটি বিশ্বাসই করতে পারেননি। দুই বছরের লাগাতার বোমাবর্ষণ ও খাদ্য অবরোধের পর এ ঘোষণায় গাজার মানুষের মনে জেগেছে এক ঝলক আশার আলো।
এ যুদ্ধবিরতির ভিত্তি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনা। শুরুতে অনেকেই এটিকে অবাস্তব বলে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, কিন্তু মিশরের শারম আল শেইখে পরোক্ষ আলোচনার মাধ্যমে ইসরায়েল ও হামাস ‘প্রাথমিক ধাপে’ এতে সম্মতি জানিয়েছে। সূত্রমতে, চুক্তির আওতায় উভয় পক্ষ পর্যায়ক্রমে বন্দি বিনিময়, সীমিত পুনর্গঠন কার্যক্রম এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতিতে মানবিক করিডর খোলার বিষয়ে একমত হয়েছে।
গাজার এ শান্তি এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ইসরায়েলের টানা অভিযানে নিহতের সংখ্যা ৬৭ হাজার ছাড়িয়েছে। নিহতদের বড় অংশই নারী ও শিশু। অবরোধের কারণে খাদ্য ও ওষুধের সংকট তীব্র হয়ে উঠেছিলো, বহু মানুষ অনাহারে দিন কাটাচ্ছিলো। হাসপাতাল, স্কুল ও আবাসিক ভবন প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
মধ্য গাজার ফিলিস্তিনি ত্রাণ সমন্বয়কারী ইয়াদ আমাউই ব্রিটিশ দৈনিক ‘দ্য গার্ডিয়ান’–কে বলেন,
আমরা বিশ্বাস করতে চাই, কিন্তু পারি না। আনন্দ ও শোক—দুটোই একসঙ্গে অনুভব করছি। এ চুক্তি যদি সত্যিই কার্যকর হয়, তাহলে হয়তো আমরা ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকেও নতুন জীবন খুঁজে পাবো।
তবে চুক্তি বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় আশঙ্কা রাজনৈতিক জটিলতা। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বর্তমানে চরম রাজনৈতিক চাপে রয়েছেন। যুদ্ধ পরিচালনায় ব্যর্থতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে দেশে-বিদেশে তার বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়ছে। ২০২৩ সালের নভেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) তার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে, যদিও ইসরায়েল আদালতের এখতিয়ার অস্বীকার করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহু এ শান্তিচুক্তিকে নিজের রাজনৈতিক জীবন বাঁচানোর সুযোগ হিসেবেও ব্যবহার করতে পারেন। কেউ কেউ মনে করছেন, তিনি আগাম নির্বাচনের ডাক দিয়ে ‘শান্তির কারিগর’ হিসেবে পুনরায় জনপ্রিয়তা ফেরানোর চেষ্টা করবেন। তবে তার ক্রমহ্রাসমান জনসমর্থন ও আন্তর্জাতিক চাপ ইঙ্গিত দিচ্ছে—ইসরায়েলি রাজনীতিতে নেতানিয়াহুর দিন ফুরিয়ে আসছে।
গাজায় এখন কেবল একটাই কামনা—এ শান্তি যেনো কাগজে নয়, মানুষের জীবনে ফিরে আসে। ধ্বংসের ভেতর থেকে তারা নতুন করে শ্বাস নিতে চায়, আবারও শিশুর হাসি শুনতে চায়। কিন্তু প্রশ্নটা থেকেই যায়: এ আশার আলো কি স্থায়ী হবে, নাকি আবারও অন্ধকার গ্রাস করবে ক্লান্ত উপত্যকাটিকে?
সবার দেশ/কেএম




























