১৭ বছরের জীবন, যা শেষ হয়ে গেলো রিকশার পাদানিতে পড়ে
আজ ২২ মে শহীদ নাফিজের জন্মদিন
১৭ বছর বয়স। এইটুকু জীবন।
যা থেমে গেলো রিকশার রড আঁকড়ে ধরেই—পুলিশের গুলিতে, রাষ্ট্রের নিষ্ঠুর নিষ্ক্রিয়তায়, আর কিছু রাজনৈতিক বর্বরতায়।
তারিখটি ছিলো ৪ আগস্ট ২০২৪
ঢাকার ফার্মগেট ফুটওভার ব্রিজের নিচে গুলিবিদ্ধ হয় গোলাম নাফিজ। তখনো দুই হাত শক্ত করে ধরে ছিলো রিকশার রড। শুধু ধরে নয়, আকড়ে—শেষ মুহূর্তে বাঁচার প্রাণপণ চেষ্টায়।
রিকশাচালক নূর মোহাম্মদ বুঝতে পারেন, ছেলেটি মরছে। তিনি দ্রুত প্যাডেল ঘুরিয়ে ছুটতে চান নিকটস্থ হাসপাতালে। কিন্তু হাসপাতালের ফটকে বাধা দেয় গুন্ডা আওয়ামী লীগের কিছু স্থানীয় নেতা।
একটা মুমূর্ষু ছেলেকে হাসপাতালে নিতে বাধা দেয়া হয়
কতটা নিষ্ঠুর হতে পারলে, কতটা অমানবিক হলে এমনটা সম্ভব—জিজ্ঞাসা রাখে সময়।
পরিবার তখনো কিছু জানে না।
তিনটার দিকে নাফিজ বন্ধুর ফোন থেকে মাকে শেষবার বলেন—
আমি ফার্মগেটে, ভালো আছি। তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরবো।
কিন্তু সে আর ফেরেনি।
রিকশার পাদানিতে ঝুলতে থাকে তার নিথর, রক্তাক্ত দেহ
আর জীবন আহমেদ নামে এক সাহসী ফটো সাংবাদিক পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে তোলে কিছু ছবি।
সে ছবি পরদিন রাত ১২টার পর মানবজমিনের প্রথম পাতায় ছাপা হয়, ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে।
তখনই মা-বাবা বুঝতে পারেন—
ছেলেটি আর নেই।
রিকশার রড আঁকড়ে ধরা হাত দেখে ছেলেকে চিনে ফেলেন মা
চাঁদের মতো মুখ রক্তে লেপটে গেছে।
আর তাদের জীবনের আকাশ ভেঙে চুরমার।
নাফিজ বনানী বিদ্যানিকেতন স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছিলো।
এইচএসসিতে ভর্তি হয়েছিল নৌবাহিনী কলেজ, ঢাকা-তে।
স্বপ্ন ছিলো আর্মি অফিসার হওয়ার।
কিন্তু সে স্বপ্নকে বুলেট বিদ্ধ করেছে এ রাষ্ট্র।
আজ, তার জন্মদিনে তার রুমে ঝুলছে একটা ব্যানার।
সে ব্যানারে আছে রিকশার পাদানিতে মাথায় জাতীয় পতাকা বাঁধা রক্তাক্ত নাফিজের সে ছবি।
তার বাবার কথা কানে বাজে—
ওই যে দেখেন, রিকশার রডটা ধইরা রাখছিলো… তখন যদি পাইতাম, একটু চেষ্টা করতে পারতাম বাঁচানোর…
এ রাষ্ট্র তাকে বাঁচায়নি
এ প্রশাসন, এ পুলিশ, এ স্বাস্থ্যব্যবস্থা—
সবাই মিলে এক তরুণকে ঠেলে দিয়েছে মৃত্যুর মুখে।
এটা কোনো দুর্ঘটনা নয়।
এটা ঠাণ্ডা মাথায় সংগঠিত হত্যা।
একটা রাষ্ট্র কীভাবে নিজের ভবিষ্যৎকে হত্যা করে, নাফিজ তার প্রমাণ।
আজ গোলাম নাফিজের জন্মদিন।
কোনো কেক কাটার উৎসব নেই।
আছে দায়, শোক, রাগ।
আর আছে একটা দৃঢ় অঙ্গীকার—
শহীদের রক্ত বৃথা যেতে দিবো না
কারণ শহীদ গোলাম নাফিজরা তাদের জীবনের বিনিময়ে জন্ম দিয়েছে এক নতুন বাংলাদেশের সম্ভাবনা।
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—
নাফিজ যে স্বপ্ন দেখেছিলো, সে স্বপ্ন কি সত্যিই বাস্তবায়িত হচ্ছে?
আজ তার জন্মদিন। আমরা তাকে ভুলিনি
ফার্মগেটের রাস্তায়, রিকশার পাদানিতে, প্রতিটি প্রতিবাদী ছবিতে
সে রয়ে গেছে—
বাংলাদেশের রক্তাক্ত বিবেক হয়ে।
সবার দেশ/কেএম




























