Sobar Desh | সবার দেশ সবার দেশ প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৯:০২, ৫ নভেম্বর ২০২৫

তিন শতাধিক বুলেট নিয়ে বেঁচে থাকা নাঈম

হাসিনা মামলার সাক্ষীর শরীর থেকে গুলি উদ্ধার, তদন্তে নতুন মোড়

হাসিনা মামলার সাক্ষীর শরীর থেকে গুলি উদ্ধার, তদন্তে নতুন মোড়
হাসিনার মামলার ৯ নং সাক্ষী নাইম শিকদার এর শরীর থেকে এই গুলি গুলো বের হয়েছে আজ ব্যাংককে। ছবি: সবার দেশ

বাংলাদেশের বহুল আলোচিত ভারতে পলাতক হাসিনার বিরুদ্ধে গণহত্যার মামলার ৯ নম্বর সাক্ষী নাইম শিকদারের শরীর থেকে অসংখ্য গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। বুধবার থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের একটি বেসরকারি হাসপাতালে তিন ঘণ্টার জটিল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে এসব গুলি বের করেন স্থানীয় সার্জনরা।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘ প্রস্তুতির পর স্থানীয় সময় দুপুরে অস্ত্রোপচার শুরু হয় এবং বিকেলের দিকে সফলভাবে গুলি অপসারণের কাজ শেষ হয়। অস্ত্রোপচারের পর নাইমকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়েছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তার শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল হলেও তিনি এখনো পর্যবেক্ষণে আছেন।

নাইম শিকদার জুলাই হত্যা মামলায় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে একজন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হিসেবে পরিচিত। কয়েক সপ্তাহ আগে অজ্ঞাত হামলাকারীদের গুলিতে গুরুতর আহত হওয়ার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে থাইল্যান্ডে নেয়া হয়।

অস্ত্রোপচারের খবর ছড়িয়ে পড়তেই ঢাকায় রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনার ঝড় উঠেছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, উদ্ধার করা গুলিগুলো সংরক্ষণ করে ফরেনসিক পরীক্ষায় পাঠানো হবে। এতে হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্র ও হামলাকারীদের পরিচয় শনাক্তে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

তদন্ত কর্মকর্তারা মনে করছেন, নাইমের জবানবন্দি এবং উদ্ধার করা গুলির ফরেনসিক রিপোর্ট মামলার গতিপথে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

খুলনার আন্দোলন থেকে হাসিনা মামলার সাক্ষী

নাইম শিকদার খুলনা সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসীন কলেজের শিক্ষার্থী এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। ২০২৪ এর ৪ আগস্ট খুলনা সিটি কর্পোরেশনের তৎকালীন মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেকের বাড়ির সামনে পুলিশের গুলিতে তিনি গুরুতর আহত হন।

সে হামলার পর তার শরীরে তিন শতাধিক বুলেট বিদ্ধ হয়, যার অধিকাংশই আজও শরীরে রয়ে গেছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, এত বেশি গুলি অপসারণ করা সম্ভব নয়, কারণ এতে জীবনহানির আশঙ্কা রয়েছে। ফলে বাকি জীবনের প্রতিটি দিন তাকে এসব বুলেট নিয়েই বাঁচতে হবে।

যন্ত্রণায় ভরা প্রতিটি দিন

নাইমের বাবা মালেক শিকদার জানান, চার মাসেরও বেশি সময় ধরে নাঈম ঠিকভাবে ঘুমোতে পারে না। সারাক্ষণ উপুড় হয়ে শুয়ে থাকে। শরীরের তিন শতাধিক বুলেট তাকে প্রতিনিয়ত যন্ত্রণা দেয়। বাবা হয়ে এটা দেখা পৃথিবীর সবচেয়ে কষ্টের বিষয়। কিন্তু চিকিৎসকরা বলেছে, কিছু করার নেই।

তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার ছেলেটা চিরদিনের জন্য পঙ্গু হয়ে গেল।

হামলার দিন যা ঘটেছিলো

ঘটনার দিন ৪ আগস্ট বিকেলে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে শহীদ হাদিস পার্ক থেকে মিছিল বের হয়। মিছিলটি কাস্টম ঘাটের দিকে যাচ্ছিলো। খুলনা সিটি কর্পোরেশনের তৎকালীন মেয়রের বাসভবনের সামনে পৌঁছালে হঠাৎ গুলি ও টিয়ারশেল ছোড়ে পুলিশ।

নাঈম জানান, 

টিয়ারশেলে চোখ বন্ধ হয়ে যায়। পাশের একটি বাড়ি থেকে টুথপেস্ট ও ঠাণ্ডা পানি নিয়ে চোখে দিলে কিছুটা দেখতে পাই। এরপর এক ছাত্রনেতা হ্যান্ডমাইক দিয়ে পুলিশকে গুলি না করার আহ্বান জানান। কিন্তু হঠাৎ পুলিশ আমাদের দিকে বন্দুক তাক করে গুলি ছোড়ে। খুব কাছ থেকেই গুলি লাগে আমার পিঠে। এরপর কিছুই মনে নেই।

হাসপাতালে উপেক্ষা ও ভয়

নাঈমের মা মোরশেদা বেগম বলেন, 

মাগরিবের পর অজ্ঞাত নম্বর থেকে ফোন আসে। গিয়ে দেখি, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছেলেকে তৃতীয় তলার এক ওয়ার্ডে ফেলে রাখা হয়েছে। ডাক্তাররা চিকিৎসা দিচ্ছিলেন না। আওয়ামী লীগ অফিসে হামলায় আহত ছাত্রলীগ নেতা সুজনের লোকজন গুলিবিদ্ধ ছাত্রদের খুঁজছিলো। ভয় পেয়ে আমরা নাঈমকে ঢেকে রাখি।

তিনি আরও বলেন, পরদিনই আমাদের হাসপাতাল থেকে চলে যেতে বলা হয়। কিন্তু ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর পরিস্থিতি বদলে যায়। চিকিৎসা ফের শুরু হয়।

এরপর একের পর এক হাসপাতালে ঘুরেছেন তারা—খুলনা মেডিকেল, খালিশপুর উপশম হাসপাতাল, যশোর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল এবং পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিন শতাধিক বুলেট রয়ে গেছে নাঈমের শরীরে।

সরকারি সাহায্য মেলেনি

নাঈমের বাবা মালেক শিকদার অভিযোগ করেন, শুনেছি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে আহতদের তালিকা করেছে সরকার। কিন্তু আমরা কোনো সরকারি সহায়তা পাইনি। কয়েকটি সংগঠন থেকে সামান্য সাহায্য পেয়েছি, তাতেই চলছি।

কলেজের পক্ষ থেকে সহায়তা

সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসীন কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ফারুখে আযম মু. আব্দুস ছালাম বলেন, নাঈম আমাদের ছাত্র। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর থেকে কলেজের পক্ষ থেকে সার্বিক খোঁজ নেয়া হচ্ছে। শিক্ষকরা যতটা সম্ভব সহযোগিতা করেছেন।

ছোট শহরের এক তরুণের অসমাপ্ত লড়াই

খুলনার দৌলতপুরের আঞ্জুমান রোডের দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া নাঈম তিন ভাইবোনের মেজ। লেখাপড়ার পাশাপাশি টিউশনি ও রং মিস্ত্রির কাজ করতেন সংসারের হাল ধরতে। কিন্তু এখন তিনি বিছানায় শুয়ে, শরীরে তিন শতাধিক বুলেট নিয়ে প্রতিটি দিন পার করছেন — ন্যায়বিচারের অপেক্ষায়, যন্ত্রণার মধ্যে।

সবার দেশ/কেএম