চিকিৎসকের জবানবন্দি ও ফাঁসির দাবি
গণঅভ্যুত্থানের রক্তাক্ত স্মৃতি: আহতদের মাথার খুলি ছিলো না
১৯ জুলাই রোগীর সংখ্যা বেড়ে গেলে গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) কর্মকর্তারা হাসপাতালে এসে নতুন গুলিবিদ্ধ ছাত্রদের ভর্তি না করার জন্য চাপ দেয়। তারা হুঁশিয়ারি দেয়, ভর্তি রোগীদেরও ছাড়তে হবে না এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
গত বছরের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালীন রাজধানীর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হাসপাতালে আনা আহতদের অবর্ণনীয় চিত্র তুলে ধরেছেন হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. মাহফুজুর রহমান। বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ দেওয়া জবানবন্দিতে তিনি জানান, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া গুরুতর আহত ১৬৭ জনের অধিকাংশের মাথার খুলি ছিলো না।
ডা. মাহফুজুর রহমান জানান, সেদিন ৫৭৫ জন গুলিবিদ্ধ ও পিলেটবিদ্ধ রোগী বহির্বিভাগে চিকিৎসা নেওয়ার পর ছেড়ে দেয়া হয়েছিলো। এদের মধ্যে অনেককেই ভর্তি করার প্রয়োজন ছিলো, কিন্তু সিট সংকুলান না হওয়ায় তা সম্ভব হয়নি। গুরুতর আহতদের মধ্যে ১৬৭ জনকে ভর্তি করা হয়, যাদের বেশিরভাগের মাথার খুলি উড়ে গিয়েছিল। চারজনকে মৃত অবস্থায় আনা হয় এবং ২৯ জন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। আইসিইউতে থাকা সাতজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ডে পাঠানো হয়েছিলো।
তিনি বলেন, আমার নেতৃত্বে ৩৩টি অস্ত্রোপচার হয়েছে। অন্তত ১৫ জনের শরীর থেকে গুলি ও পিলেট বের করা সম্ভব হয়েছে। কিছু গুলি বের করা সম্ভব হয়নি। অনেক আহত ব্যক্তি তাদের শরীর থেকে বের করা গুলি নিজের কাছে রাখতে চেয়েছিলেন।
পুলিশের চাপ ও চিকিৎসকদের কৌশল
চিকিৎসক আরও জানান, গত বছরের ১৯ জুলাই রোগীর সংখ্যা বেড়ে গেলে গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) কর্মকর্তারা হাসপাতালে এসে নতুন গুলিবিদ্ধ ছাত্রদের ভর্তি না করার জন্য চাপ দেয়। তারা হুঁশিয়ারি দেয়, ভর্তি রোগীদেরও ছাড়তে হবে না এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ পরিস্থিতিতে চিকিৎসকরা কৌশলে ভর্তি রেজিস্টারে আহতদের জখমের কারণ গুলিবিদ্ধের পরিবর্তে সড়ক দুর্ঘটনা বা অন্যান্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
ফাঁসির দাবি ও আদালতে আবেগঘন মুহূর্ত
জবানবন্দিতে মাহফুজুর রহমান বলেন,
নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচার গুলি চালিয়ে যারা গণহত্যা চালিয়েছে, তাদের বিচার ও প্রকাশ্যে ফাঁসি হওয়া উচিত।
তিনি এ ঘটনার জন্য সরাসরি দায়ী হিসেবে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ফ্যাসিস্ট হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, আওয়ামী লীগ নেতা ওবায়দুল কাদের এবং সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী আরাফাতের নাম উল্লেখ করেন।
রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি পরিচালনা করেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম ও গাজী এস এইচ তামিম। অপরদিকে পলাতক আসামি শেখ হাসিনা ও কামালের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আমির হোসেন এবং গ্রেফতার হওয়া সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী যায়েদ বিন আমজাদ।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও মানবাধিকার সংস্থার উদ্বেগ
গণঅভ্যুত্থানের সময়কার এই সহিংস দমন-পীড়নের বিষয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ একাধিক সংগঠন ঘটনার স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরও জানিয়েছে, ছাত্র আন্দোলন দমনে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ মানবাধিকার লঙ্ঘনের স্পষ্ট উদাহরণ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এ জবানবন্দি প্রমাণ করছে যে দমন-পীড়ন ছিল পরিকল্পিত এবং রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে একটি গণহত্যার রূপ দেওয়া হয়েছিলো। তারা মনে করছেন, এ বিচার প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নজর কাড়বে এবং ভবিষ্যতের ক্ষমতার রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা
এ মামলার পাশাপাশি ফ্যাসিস্ট হাসিনার বিরুদ্ধে আরও দুটি মামলা চলছে। একটি পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুম-খুনের ঘটনায় এবং অন্যটি মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতের সমাবেশে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায়। উভয় মামলাই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন।
মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্তদের বিচার কার্যক্রম বর্তমানে দুটি ট্রাইব্যুনালে চলছে। কূটনৈতিক মহল বলছে, এ মামলাগুলোর রায় শুধু দেশের রাজনীতিতে নয়, আঞ্চলিক কূটনীতিতেও ব্যাপক প্রভাব ফেলবে।
সবার দেশ/কেএম




























