Sobar Desh | সবার দেশ

প্রকাশিত: ১২:৫৭, ৪ অক্টোবর ২০২৫

যুগান্তকারী গবেষণার আভাস

ঘরে পোষা প্রাণী থাকলে বাড়ে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা

ঘরে পোষা প্রাণী থাকলে বাড়ে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা
ছবি: সংগৃহীত

পোষা প্রাণী কেবল বিনোদন বা একাকীত্ব দূর করার সঙ্গী নয়, মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে—সাম্প্রতিক বছরগুলোর একাধিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা এমনটিই বলছে। বিশেষ করে শৈশবেই যদি কেউ প্রাণীর সাহচর্যে বড় হয়, তবে হাঁপানি, অ্যালার্জি, একজিমা, এমনকি টাইপ-১ ডায়াবেটিস বা অন্যান্য অটোইমিউন রোগের ঝুঁকিও অনেকাংশে কমে যায়।

আমিশ সম্প্রদায়: রহস্যময় স্বাস্থ্য সুরক্ষার মডেল

এ প্রসঙ্গে চিকিৎসা গবেষণার ক্ষেত্রে সবচেয়ে আলোচিত নাম হলো আমিশ সম্প্রদায়। ১৮শ শতকে ইউরোপ থেকে উত্তর আমেরিকায় চলে আসা এ গোষ্ঠী আজও ঐতিহ্যবাহী, সরল জীবনযাপন করে আসছে। তারা আধুনিক প্রযুক্তি এড়িয়ে কৃষি ও গবাদি পশুপালনকে কেন্দ্র করে জীবন কাটায়।

১৯৬০-এর দশক থেকে পশ্চিমা দুনিয়ায় অ্যালার্জি, হাঁপানি ও অন্যান্য ইমিউন রোগ বেড়েই চলেছে, অথচ আমিশদের মধ্যে এর প্রভাব প্রায় নেই বললেই চলে। গবেষকরা খুঁজে পেয়েছেন এর মূল রহস্য—শৈশব থেকেই গবাদি পশুর সঙ্গে নিবিড় সংস্পর্শ। প্রাণীদের মাধ্যমে তারা নানা ধরনের জীবাণু বা মাইক্রোবের সংস্পর্শে আসে, যা তাদের শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে প্রশিক্ষণ দেয়।

আমিশ বনাম হুটেরাইটস: বৈজ্ঞানিক প্রমাণ

২০১২ সালে ইন্ডিয়ানার আমিশ শিশু ও সাউথ ডাকোটার হুটেরাইট সম্প্রদায়ের শিশুদের ওপর এক গবেষণা চালানো হয়। উভয়ের জীবনযাত্রায় মিল থাকলেও পার্থক্য হলো কৃষি প্রযুক্তিতে। হুটেরাইটসরা আধুনিক শিল্পায়িত কৃষি পদ্ধতি গ্রহণ করেছে, আমিশরা এখনো প্রাচীন রীতিতে পশুপালন করে।

ফলাফল চমকপ্রদ—হুটেরাইট শিশুদের মধ্যে অ্যালার্জি ও হাঁপানির ঝুঁকি আমিশ শিশুদের তুলনায় চার থেকে ছয় গুণ বেশি। গবেষকরা লক্ষ্য করেন, আমিশ শিশুদের শরীরে প্রতিরোধ ক্ষমতা গঠনে মুখ্য টি-সেলগুলো অনেক বেশি সক্রিয়। তাদের ঘরের ধূলিকণায়ও বেশি বৈচিত্র্যময় মাইক্রোব পাওয়া যায়। একে বলা হচ্ছে ‘মিনি-ফার্ম এফেক্ট’—অর্থাৎ যত বেশি প্রাণীর সাহচর্য, তত কম অ্যালার্জি ঝুঁকি।

কুকুর-বিড়ালের প্রভাব

গবেষণা বলছে, কেবল খামারের প্রাণী নয়, ঘরে পোষা কুকুর বা বিড়ালও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে পারে।

  • যারা কুকুরের সঙ্গে বড় হয়, তাদের অ্যালার্জির ঝুঁকি গড়ে ১৩–১৪% কম।
  • একজিমার ঝুঁকি বহুলাংশে হ্রাস পেতে পারে, যদি শিশুর পরিবারে কুকুর থাকে।
  • পোষা প্রাণী অনেকটা ‘প্রোবায়োটিকের মতো’ কাজ করে। তাদের শরীরের ব্যাকটেরিয়া মালিকের শরীরে ছড়িয়ে গিয়ে অন্ত্র ও ত্বকের মাইক্রোবায়োমকে বৈচিত্র্যময় করে।

প্রাচীন মাইক্রোবের সংরক্ষণ

আইরিশ ট্র্যাভেলারস, ফিজি, মঙ্গোলিয়া বা তানজানিয়ার উপজাতির মাইক্রোবায়োম নিয়েও গবেষণা চালানো হয়। দেখা গেছে, যেসব সম্প্রদায় আজও পশুপালন বা শিকারনির্ভর জীবনযাপন করছে, তাদের শরীরের মাইক্রোব আধুনিক মানুষের তুলনায় বহুগুণ বৈচিত্র্যময়। এগুলোই তাদের অটোইমিউন রোগ থেকে রক্ষা করছে।

আধুনিক চিকিৎসা গবেষণায় নতুন দিক

গবেষকরা এখন খুঁজছেন, কীভাবে প্রাণীর উপস্থিতিকে আধুনিক সমাজে ফিরিয়ে আনা যায়।

  • মার্কিন গবেষকরা অবাঞ্ছিত কুকুরকে মানুষদের সংস্পর্শে এনে প্রতিরোধ ক্ষমতা মাপার পরীক্ষা চালাচ্ছেন।
  • ইতালিতে শিশুদের জন্য খামার তৈরি করা হয়েছে, যেখানে তারা ঘোড়ার সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে। দেখা গেছে, তাদের অন্ত্রে উপকারী মেটাবোলাইট বাড়ছে।
  • অনেক বিজ্ঞানী মনে করছেন, ভবিষ্যতে **পোষা প্রাণীর খাবার** এমনভাবে তৈরি হতে পারে যাতে তাদের শরীরের ব্যাকটেরিয়া আরও স্বাস্থ্যসম্মত হয়, আর তা মালিকদের কাছেও পৌঁছায়।

সারকথা

অধ্যাপক জ্যাক গিলবার্টের ভাষায়,

মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা হাজার হাজার বছর ধরে প্রাণীর ব্যাকটেরিয়ার সংস্পর্শে অভ্যস্ত হয়েছে। তাই আজও প্রাণীর উপস্থিতি আমাদের ইমিউন সিস্টেমকে সক্রিয় করে তোলে, সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে এবং অ্যালার্জির ঝুঁকি কমায়।

অতএব, আধুনিক জীবনযাত্রায় পোষা প্রাণী কেবল মানসিক প্রশান্তিই দেয় না, বরং আমাদের শারীরিক স্বাস্থ্য ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার জন্যও এক অমূল্য সহায়ক হতে পারে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

সবার দেশ/কেএম