জুলাই জাতীয় সনদের খসড়া প্রকাশ, রাষ্ট্র সংস্কারে ঐতিহাসিক রূপরেখা
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে এমন একটি নথি প্রকাশ করেছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ নামের এই খসড়া সনদে গণতন্ত্র, সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য বিস্তারিত রূপরেখা দেয়া হয়েছে। খসড়া সনদ ইতিমধ্যেই দেশের ৩৮টি রাজনৈতিক দল ও জোটের কাছে পাঠানো হয়েছে।
অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট: স্বৈরাচার পতনের গল্প
খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব অংশগ্রহণের ফলে স্বৈরাচারী সরকার পতন ঘটে। আন্দোলনের সময় নারী ও শিশুসহ ১,৪০০-এর বেশি মানুষ প্রাণ হারায় এবং ২০,০০০-এর বেশি মানুষ আহত হয়। এ আত্মত্যাগের বিনিময়ে জনগণের হাতে আসে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামো পুনর্গঠনের সুযোগ।
নথিতে বলা হয়, মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে গণতন্ত্রের স্বপ্ন দেখা হয়েছিলো, পাঁচ দশক পরও তা পূর্ণতা পায়নি। দলীয় প্রভাব, বিচারহীনতা, দুর্নীতি এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের অপব্যবহার গণতন্ত্রকে বারবার ব্যর্থ করেছে।
ছয়টি সংস্কার কমিশনের ভূমিকা
অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে ২০২৪ সালের অক্টোবরে গঠিত হয় ছয়টি পৃথক সংস্কার কমিশন—
- সংবিধান সংস্কার কমিশন
- নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন
- বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন
- জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন
- পুলিশ সংস্কার কমিশন
- দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কার কমিশন
এ কমিশনগুলো ২০২৫ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত বিস্তৃত কাজ করে এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে কাঠামোগত ও আইনি পরিবর্তনের সুপারিশ জমা দেয়।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনার ধাপ
২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ছয়টি কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে ব্যাপক আলোচনা চালায়।
- প্রথম পর্যায়ে ৩২টি দল অংশ নেয়, অনুষ্ঠিত হয় ৪৪টি বৈঠক।
- দ্বিতীয় পর্যায়ে অগ্রাধিকারভিত্তিক ২০টি বিষয়ের ওপর গভীর আলোচনা হয়।
- মতামতের জন্য ১৬৬টি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ দলগুলোর কাছে পাঠানো হয়।
এ দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কমিশন একটি অভিন্ন সংস্কার রূপরেখা প্রস্তুত করে, যা জুলাই জাতীয় সনদে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
সনদের মূল বিষয়বস্তু
খসড়া সনদে রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য কয়েকটি প্রধান অঙ্গীকার ও প্রস্তাব উল্লেখ করা হয়েছে—
- সংবিধানের মৌলিক সংস্কার: গণতান্ত্রিক নীতি পুনঃপ্রতিষ্ঠা, ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ, এবং রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোর সুরক্ষা।
- নির্বাচনী ব্যবস্থার পুনর্গঠন: নিরপেক্ষ, অংশগ্রহণমূলক ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্য নতুন আইন ও কমিশনের কাঠামো।
- বিচার বিভাগের স্বাধীনতা: রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত একটি স্বচ্ছ বিচার ব্যবস্থা গঠন।
- জনপ্রশাসন সংস্কার: দলীয়করণ দূর করে দক্ষতা, জবাবদিহি ও জনগণের সেবার মনোভাব জোরদার করা।
- পুলিশ সংস্কার: নিরপেক্ষ ও মানবাধিকার রক্ষাকারী পুলিশ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা।
- দুর্নীতি দমন কমিশনের শক্তিশালীকরণ: রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত এবং কার্যকর দুর্নীতি দমন প্রক্রিয়া।
জুলাই জাতীয় সনদের অঙ্গীকারনামা
খসড়ায় সই করা রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিশ্রুতি দিয়েছে—
- সনদের সব সুপারিশ দুই বছরের মধ্যে বাস্তবায়ন করা হবে।
- প্রয়োজনীয় সংবিধান ও আইন সংশোধন দ্রুত সম্পন্ন করা হবে।
- সংস্কারের প্রতিটি ধাপে আইনি ও সাংবিধানিক সুরক্ষা দেয়া হবে।
- ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ ও আন্দোলনকারীদের প্রতি ‘রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি’ প্রদান করা হবে।
ভবিষ্যৎ কার্যক্রম ও সম্ভাবনা
বর্তমানে দ্বিতীয় পর্যায়ের আলোচনায় নতুন কিছু প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত হওয়ার অপেক্ষা রয়েছে। চূড়ান্ত সনদ প্রকাশের পরপরই অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কার কার্যক্রম শুরু করবে।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের ভাষায়,
এ সনদ কেবল একটি নথি নয়, বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক যাত্রার দিকনির্দেশক।
সবার দেশ/কেএম




























