নির্বাচনের আগে প্রশাসনে অচলাবস্থা
জনপ্রশাসনে ‘ভুতুড়ে শূন্যতা’: সচিবের চেয়ারে বসতে অনীহা!
নির্বাচনের সময় জনপ্রশাসন সচিব মানেই ওএসডি হওয়ার নিশ্চয়তা। আবার নানা পক্ষের বিরাগভাজন হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। তাই এখন কেউই যেতে চাচ্ছেন না।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র কয়েক মাস বাকি। এমন এক সংকটময় সময়ে দেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী দফতর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিবের চেয়ারটি ১৫ দিনেরও বেশি সময় ধরে ফাঁকা—যা বাংলাদেশের প্রশাসনিক ইতিহাসে এক নজিরবিহীন রেকর্ড। এর আগে এত দীর্ঘ সময় এ গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য থাকার উদাহরণ নেই।
মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম এখন চলছে রুটিন দায়িত্বে, কিন্তু পূর্ণ সচিব না থাকায় ফাইলের গতি মন্থর হয়ে গেছে। কর্মকর্তা থেকে উপসচিব—সবার মুখে এখন এক প্রশ্ন, ‘কে আসছেন জনপ্রশাসনের শীর্ষ চেয়ারে?’
সিনিয়র সচিবদের অনাগ্রহ
অন্তর্বর্তী সরকার গত ২১ সেপ্টেম্বর নানা বিতর্কের কারণে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. মোখলেসুর রহমানকে সরিয়ে দেয়। কিন্তু দুই সপ্তাহ পার হলেও নতুন কাউকে নিয়োগ দেয়া যায়নি। আপাতত রুটিন দায়িত্বে আছেন ১৮তম ব্যাচের কর্মকর্তা ড. আবু শাহীন মো. আসাদুজ্জামান।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, এ পদে নতুন নিয়োগ দিতে সরকারের দেরি ‘দূরদর্শিতার অভাবের পরিচায়ক’। কারণ, প্রশাসনের মেরুদণ্ড বলা হয় এ মন্ত্রণালয়কেই—যেখান থেকে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতির মতো সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসে।
তবে এবার সে মন্ত্রণালয়ের সচিব হতে অনীহা প্রকাশ করছেন অনেক সিনিয়র কর্মকর্তা। একাধিক সূত্র বলছে, ‘এই পদে বসলে বিতর্কে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি শতভাগ।’ নির্বাচনের সময় মাঠ প্রশাসন সামলানো, রাজনৈতিক চাপ মোকাবিলা, এবং বদলি-বাণিজ্যের অভিযোগে জড়িয়ে পড়া—এসব কারণেই সিনিয়র সচিবরা নীরবে পিছিয়ে যাচ্ছেন।
একজন দায়িত্বশীল সিনিয়র সচিবের ভাষায়,
নির্বাচনের সময় জনপ্রশাসন সচিব মানেই ওএসডি হওয়ার নিশ্চয়তা। আবার নানা পক্ষের বিরাগভাজন হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। তাই এখন কেউই যেতে চাচ্ছেন না।
কে আসছেন এ চেয়ারে?
সূত্রগুলো জানায়, এ পদে কয়েকজন প্রভাবশালী সচিবের নাম বিবেচনায় রয়েছে—
- ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এ এস এম সালেহ আহমেদ
- সড়ক পরিবহন বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. এহছানুল হক
- স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. নাসিমুল গনি
- নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়—তাদের কেউই এ চেয়ারে বসতে রাজি নন।
রাজনীতি বনাম প্রশাসন
এদিকে রাজনৈতিক তদবিরও চলছে জোরেশোরে। একাধিক সূত্রে জানা গেছে, অন্তত তিনটি বড় রাজনৈতিক দল নিজেদের আস্থাভাজন কর্মকর্তাকে এ পদে বসাতে মরিয়া। এমনকি জনপ্রশাসনের বাইরে থেকেও সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়ে শীর্ষ পর্যায়ে আলোচনা হচ্ছে।
গুঞ্জন রয়েছে—একটি দল স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব রেজাউল মাকছুদ জাহেদী বা গৃহায়ণ ও গণপূর্ত সচিব মো. নজরুল ইসলামকে এ পদে বসানোর চেষ্টা করছে। তবে তাদের রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়ে অন্য দলের আপত্তি রয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে, সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে স্বরাষ্ট্র ও জনপ্রশাসন সচিবদের অদলবদলের চিন্তাও হয়েছিলো। কিন্তু আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ট্যাগ দিয়ে বর্তমান স্বরাষ্ট্র সচিবকে এ পদে বসানো নিয়ে রাজনৈতিক আপত্তি ওঠায় সে উদ্যোগ স্থগিত হয়েছে।
আলোচনায় নতুন নাম
একাধিক সূত্র জানায়, এখন আলোচনায় রয়েছেন দুইজন মধ্যম-স্তরের কিন্তু আস্থাভাজন কর্মকর্তা—
- প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের সচিব মো. সাইফুল্লাহ পান্না
- যুব ও ক্রীড়া সচিব মাহবুব আলম (যিনি এর আগে জনপ্রশাসনের প্রশাসন বিভাগে দায়িত্ব পালন করেছেন)
প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা এবং রাজনৈতিকভাবে তুলনামূলক নিরপেক্ষ ভাবমূর্তি—এ দুটি কারণেই মাহবুব আলমের নাম এখন সবচেয়ে আলোচিত।
সিদ্ধান্তের অপেক্ষা
গতকাল জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে সম্ভাব্য নিয়োগ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। তবে রাত ৮টা পর্যন্ত কোনো সামারি প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে পাঠানো হয়নি বলে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন।
সূত্রগুলোর মতে, এ সপ্তাহের মধ্যেই সচিব নিয়োগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
তবে প্রশ্ন রয়ে গেছে—যে পদে সবাই ঝুঁকি দেখছেন, সেখানে শেষ পর্যন্ত কে সাহস করে বসবেন?
সবার দেশ/কেএম




























