Sobar Desh | সবার দেশ সবার দেশ প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১১:৫৮, ১২ ডিসেম্বর ২০২৫

পিলখানা হত্যাকাণ্ড আড়াল করতেই ‘তাপস হত্যাচেষ্টা’ নাটক

পিলখানা হত্যাকাণ্ড আড়াল করতেই ‘তাপস হত্যাচেষ্টা’ নাটক
ছবি: সংগৃহীত

পিলখানায় বিডিআর হত্যাকাণ্ডের পর দেশের সেনাবাহিনীতে যে ভয়, অবিশ্বাস ও অস্থিরতার পরিবেশ তৈরি হয়েছিলো—তার সুযোগ নেয়া হয়েছিলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে। বিডিআর হত্যাকাণ্ড নিয়ে যারা সত্য উদঘাটনে সোচ্চার ছিলেন, সে সৎ ও দেশপ্রেমিক সেনা কর্মকর্তাদের একে একে সরিয়ে দেয়া হয় সেনাবাহিনী থেকে। 

শুধু সরিয়েই নয়; ‘তাপস হত্যাচেষ্টা মামলা’ নামের একটি সাজানো ঘটনায় কয়েকজন কর্মকর্তাকে আটক করে নির্যাতনের অভিযোগও উঠে এসেছে।

জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন পিলখানা হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে যে বিস্তৃত প্রতিবেদন ৩০ নভেম্বর প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দিয়েছে, সেখানে এ চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে—এ মামলার মূল উদ্দেশ্য ছিলো সেনাবাহিনীর ভেতরে ‘ইসলামি জঙ্গিবাদ’ রয়েছে, এমন একটি বিভ্রান্তিকর ধারণা প্রতিষ্ঠা করা এবং বিদ্রোহের প্রকৃত রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতাকে আড়াল করা।

কমিশনের সাক্ষ্যে উঠে আসে, তাপসকে আজীবন নিরাপত্তা দেয়ার অজুহাতে এবং পুরো বাহিনীর ভেতরে ভয় ঢোকানোর লক্ষ্যে সাজানো হয় এ মিথ্যা মামলা। যাতে কোনও সেনা কর্মকর্তা বিডিআর বিদ্রোহের পেছনে থাকা রাজনৈতিক প্রভাব সম্পর্কে সরব হতে না পারেন।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা পাঁচ জন অফিসার—ক্যাপ্টেন রেজাউল করিম, ক্যাপ্টেন খন্দকার রাজীব হোসেন, ক্যাপ্টেন সুবায়েল বিন রফিক, ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ ফুয়াদ খান এবং মেজর হেলাল—সবাই সে সময় বিডিআর প্রধান কার্যালয়ের তদন্ত, সমন্বয়, উদ্ধার ও আলামত সংগ্রহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছিলেন। বিদ্রোহ দমনে তারা ছিলেন সক্রিয় ও সরব। ফলে তাদেরই টার্গেট করা হয়।

সাক্ষ্যে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, এ অফিসারদের একজনকে পিলখানা থেকে সরাসরি তুলে নেয় ডিজিএফআই। আবার দুজনকে ছলচাতুরীর মাধ্যমে পিলখানা থেকে বের করে নিয়ে যাওয়া হয়, পরে তারা আটক হন। আটক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ডিজিএফআইয়ের নির্যাতন, ব্ল্যাকমেইল ও সাদা কাগজে সই নেয়ার অভিযোগও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

তদন্ত আদালতে উপস্থিত জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন—অভিযুক্ত অফিসাররা আদালতে উপস্থিত হওয়ার সময় ছিলেন ‘সম্পূর্ণ ভেঙে পড়া’ অবস্থায়। তদন্তে যেসব আলামত দেখানো হয়েছে—যেমন বিস্ফোরক, ডেটোনেটর, রহস্যজনক অস্ত্রভর্তি ট্রাংক—সবই ছিলো অবিশ্বাস্য, অগ্রহণযোগ্য এবং সাজানো। সেনাবাহিনীর ইউনিট কমান্ডাররাও সাক্ষ্যে জানিয়েছিলেন—এ ধরনের আলামত উদ্ধার বা অভিযান কখনোই ঘটেনি।

অন্যদিকে, বাদী ফজলে নূর তাপস নিজেই সাক্ষ্য-প্রমাণে ব্যর্থ হওয়ায় পুলিশ পরবর্তীতে মামলাটিকে ‘ভিত্তিহীন’ ঘোষণা করে। তদন্ত প্রতিবেদনে স্পষ্ট বলা আছে—মামলায় কোনও সামরিক কর্মকর্তার নাম ছিলো না।

স্বাধীন তদন্ত কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, তাপস হত্যাচেষ্টা মামলাটি ছিলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এক নাটক, যার মাধ্যমে সেনাবাহিনীর মনোবল নষ্ট করা, বিডিআর হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত ষড়যন্ত্রকারীদের আড়াল করা এবং ভয়াবহ একটি ফ্যাসিবাদী পরিবেশ তৈরি করাই ছিলো মূল লক্ষ্য।

এ সাজানো মামলার মাধ্যমে সেনাবাহিনীর সৎ, দায়িত্বশীল এবং সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো কর্মকর্তা—যারা পিলখানা হত্যাকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ জানতেন—তাদেরই অপরাধী বানিয়ে ভয় দেখানো হয়। আর সে ভয় তৈরি করেই থামিয়ে দেয়া হয় বিদ্রোহের পেছনের আসল শক্তির সন্ধান।

প্রতিবেদনটি তাই স্পষ্টভাবে বলছে—তথাকথিত তাপস হত্যাচেষ্টা ছিলো একটি পরিকল্পিত নাটক, যার লক্ষ্য ছিলো সত্যকে চাপা দেয়া এবং পিলখানার ৫৭ সেনা অফিসারের হত্যার বিচারকে চিরতরে ভিন্ন খাতে ঘুরিয়ে দেয়া।

সবার দেশ/কেএম

সর্বশেষ