Sobar Desh | সবার দেশ বিশেষ প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০১:৫৪, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

২৯৯ আসনে ব্যালটের লড়াই, নজিরবিহীন নিরাপত্তায় নির্বাচন কমিশন

গণতন্ত্রে ফেরার ভোট উৎসব আজ

গণতন্ত্রে ফেরার ভোট উৎসব আজ
.

সারাদেশে বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের উৎসব চলছে আজ। সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত টানা ভোটগ্রহণ চলবে দেশের ২৯৯টি আসনে। শেরপুর-৩ আসনে এক প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে সেখানে ভোট স্থগিত রয়েছে। জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে গণভোট একযোগে হওয়ায় এবারের ভোটকে ঘিরে জনমনে রয়েছে বাড়তি আগ্রহ, আবার সাম্প্রতিক কিছু অভিযোগ-অপপ্রচারকে ঘিরে রয়েছে চাপা উৎকণ্ঠাও।

দীর্ঘ ১৭ বছর পর ভোটাধিকার ফিরে পাওয়ায় লাখ লাখ মানুষ গ্রামে ফিরছেন ভোট দিতে। গত এক সপ্তাহ ধরে বাড়ি ফেরার পালা শুরু হয়েছে। রাজধানী ঢাকা এখন ফাঁকা, বাস, ট্রেন ও লঞ্চে উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। নাগরিকরা নিজ নিজ এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দিতে যাচ্ছেন। টিকিট না পেয়ে অনেকে ট্রেনের ছাদে চড়ে বাড়ি ফিরেছেন। মহাসড়কে ছিলো যানজট। লঞ্চঘাটেও ছিলো চাপ। রিকশাচালক, শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী—বিভিন্ন পেশার মানুষ ভোটাধিকার প্রয়োগের তাগিদে ঢাকা ছেড়েছেন। অনেক রিকশাচালক নিজ রিকশা চালিয়েই বাড়ি গেছেন।

বাড়ি ফেরা যাত্রীদের ভাষ্য, দীর্ঘ সময় পর তারা সত্যিকারের ভোট দেয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। কেউ বলছেন এটি অধিকার ফিরে পাওয়ার উৎসব, কেউ বলছেন গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দিন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভোটের এ স্বতঃস্ফূর্ত আগ্রহ নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের শিক্ষক প্রফেসর তারানা বেগম বলেন, বিগত বছরগুলোতে ভোটের নামে যা হয়েছে তা ছিলো তামাশা। দীর্ঘদিন পর মানুষ এবার বিশ্বাস করছে, তারা নিজ নিজ এলাকায় নাগরিক অধিকার প্রয়োগ করতে পারবে।

ফিরতি যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘ ১৭ বছর পর অবাধ, সুষ্ঠু ও জবাবদিহিমূলক ভোট দেয়ার প্রত্যাশায় শহর থেকে গ্রামে ফিরছেন মানুষ। পঞ্চগড়গামী নীলসাগর ট্রেনের একজন যাত্রী বলেন, নির্বাচনের আনন্দের কাছে পথের কষ্ট কিছু নয়। কমলাপুর স্টেশনে দেখা গেছে, ছাদভর্তি ট্রেন ছেড়ে যাচ্ছে, রেলওয়ে পুলিশ বাধা দিতে পারছে না। চালকরা নিরাপত্তার জন্য যাত্রীদের সামনের অংশে দাঁড়ানো থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করছেন।

সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে নারী শ্রমিক সাজেদা বেগম বলেন, দীর্ঘদিন পর ভোট দেয়ার সুযোগ পাইছি। সরকার ছুটি দিয়েছে। তাই কষ্ট সহ্য করেই বাড়ি যাচ্ছি। টাঙ্গাইলগামী ব্যবসায়ী রফিক বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছর ভোটাধিকার বঞ্চিত হয়েছিলাম। আজ দেশের উন্নয়নের জন্য যোগ্য নির্বাচিত প্রতিনিধি নির্বাচন করা জরুরি।

পরিবহন মালিকরা জানিয়েছেন, নির্বাচনের কারণে যাত্রী চাপ এতটা বৃদ্ধি পাবে তা তারা কল্পনাও করেননি। সাড়ে আট হাজার গাড়ি রিকুইজিশন, যানবাহনের স্বল্পতা এবং ভোট উৎসবের ঢলে পরিস্থিতি কঠিন হয়েছে। ঢাকার যাত্রাবাড়িতে পর্যাপ্ত গাড়ি থাকায় যাত্রীদের ও বাস কর্মীদের সঙ্গে ভাড়া নিয়ে দরকষাকষি দেখা গেছে।

রিকশাচালকরা ভোটকে আনন্দমুখর ও উৎসবমুখর মনে করছেন। প্রফেসর তারানা বেগম বলেন, মানুষ বহুদিন বঞ্চিত থাকার পর এবার ভোটের আবহকে উৎসবমুখর করেছে। আশা করি, আজকের নির্বাচনে তাদের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটবে এবং গণতন্ত্র সুসংহত হবে।

ভোট উৎসবকে সফল করতে ইতোমধ্যে কেন্দ্রে কেন্দ্রে ইতোমধ্যে ব্যালট পেপার, ব্যালট বাক্স ও নির্বাচনী সরঞ্জাম পৌঁছে গেছে সেনা পাহারায়। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অধিকাংশ কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে, প্রথমবারের মতো ব্যবহার হচ্ছে ড্রোন ও বডি-ওর্ন ক্যামেরা।

এবারের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে ৫০টি রাজনৈতিক দল। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ২ হাজার ২৮ জন। এর মধ্যে দলীয় প্রার্থী ১ হাজার ৭৫৫ জন এবং স্বতন্ত্র ২৭৩ জন। নারী প্রার্থী রয়েছেন ৮৩ জন। বিএনপি সর্বাধিক ২৯১ জন প্রার্থী দিয়েছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ২৫৮, জামায়াতে ইসলামী ২২৪ (ইসির হিসাবে ২২৮), জাতীয় পার্টি ২০০, গণঅধিকার পরিষদ ৯৪ এবং এনসিপি ৩২ জন প্রার্থী নিয়ে মাঠে রয়েছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় আওয়ামী লীগ এ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না।

ধানের শীষ, দাঁড়িপাল্লা, হাতপাখা, শাপলা, কলি, ট্রাকসহ বিভিন্ন প্রতীকে চলছে ভোটের লড়াই। বিশ্লেষকদের মতে, মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীদের মধ্যে; তবে আসন বণ্টনে কারা এগিয়ে থাকবে, তা নির্ধারণ করবে তরুণ ও নারী ভোটারদের সক্রিয়তা।

মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন। পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১, নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ এবং হিজড়া ভোটার ১ হাজার ২৩২ জন। নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, প্রায় সাড়ে ৪ কোটি তরুণ ভোটারই এবারের ফল নির্ধারণে বড় ফ্যাক্টর হতে পারেন। অভিযোগ রয়েছে, গত ১৫ থেকে ১৭ বছরে বিপুলসংখ্যক তরুণ প্রথমবারের মতো অবাধ পরিবেশে ভোট দেয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।

তবে নির্বাচনকে ঘিরে বিতর্কও রয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে অর্থ বিতরণ, অপপ্রচার ও ভয়ভীতির অভিযোগ তোলা হয়েছে। বিএনপি অভিযোগ করেছে, তাদের বিজয় ঠেকাতে একটি গোষ্ঠী টাকা ছড়িয়ে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী তাদের নেতার কাছ থেকে টাকা উদ্ধারের ঘটনাকে ‘সাজানো নাটক’ বলে দাবি করেছে। নির্বাচন কমিশন বলেছে, ভোট কেনাবেচা বা অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নজিরবিহীন প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। ইসির তথ্য অনুযায়ী, মোট ৯ লাখ ৭০ হাজারের বেশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। এর মধ্যে সেনাবাহিনীর ১ লাখ ৩ জন সদস্য, নৌবাহিনী ৫ হাজার, বিমানবাহিনী ৩ হাজার ৭৩০, বিজিবি ৩৭ হাজার ৪৫৩, কোস্টগার্ড ৩ হাজার ৫৮৫, পুলিশ ১ লাখ ৮৭ হাজার ৬০৩, র‍্যাব ৯ হাজার ৩৪৯ এবং আনসার ও ভিডিপি ৫ লাখ ৭৬ হাজার ৪৮৩ জন। এছাড়া বিএনসিসি ক্যাডেট ও গ্রামপুলিশ সদস্যরাও দায়িত্বে রয়েছেন। নির্বাচন পরিচালনায় নিয়োজিত আছেন ৬৫৭ জন বিচারিক হাকিম ও এক হাজারের বেশি নির্বাহী হাকিম।

দেশে ও প্রবাসে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিয়েছেন ১১ লাখের বেশি ভোটার। ইতোমধ্যে বিপুলসংখ্যক ব্যালট রিটার্নিং কর্মকর্তাদের হাতে পৌঁছেছে। বিকাল সাড়ে ৪টার মধ্যে পৌঁছানো পোস্টাল ব্যালট গণনায় অন্তর্ভুক্ত হবে। জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের দুটি ব্যালট একসঙ্গে গণনা করা হবে। অধিকাংশ আসনের ফল মধ্যরাতের মধ্যেই পাওয়া যেতে পারে বলে জানিয়েছে কমিশন।

এবারের নির্বাচন ঘিরে আন্তর্জাতিক আগ্রহও উল্লেখযোগ্য। প্রায় ৪০০ আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও ১৯৭ জন বিদেশি সাংবাদিক নির্বাচন পর্যবেক্ষণে রয়েছেন। দেশীয় পর্যবেক্ষক রয়েছেন ৪৫ হাজারের বেশি। জাতিসংঘ নারীদের নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।

প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস ভোটারদের সচেতনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন বলেছেন, ভোটদান শুধু অধিকার নয়, দায়িত্বও। তিনি রাজনৈতিক দল ও ভোটারদের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রেখে জয়-পরাজয় মেনে নেয়ার আহ্বান জানান।

দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপোড়েন, গণঅভ্যুত্থান ও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনকে ঘিরে প্রত্যাশা তাই অনেক। আজকের ভোট শুধু সংসদ সদস্য বাছাই নয়—অনেকের কাছে এটি নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা, গণতান্ত্রিক আস্থার পুনর্গঠন এবং ভবিষ্যৎ পথ নির্ধারণের দিন।

সবার দেশ/কেএম

শীর্ষ সংবাদ:

‘নয়ন ভরা জল গো তোমার’ গেয়ে ভাইরাল ফরিদপুরের ‘লাইলী খালা’
কারামুক্ত এনসিপি নেতা তারেক রেজা
শতকোটিপতি ক্লাবে মেসির ঐতিহাসিক প্রবেশ
ব্রাজিল সাপোর্ট করতে অনেক লজ্জা লাগে: হিমি
হজ পালন করতে গিয়ে ২৮ বাংলাদেশির মৃত্যু
মধ্যরাতে জঙ্গল সলিমপুরে র‍্যাব ক্যাম্পে গুলিবর্ষণ
যমুনা সেতুর পূর্বপাড়ে ভয়াবহ ট্রাক দুর্ঘটনা, নিহত ১৫
মেট্রোরেলে ২৫% ছাড় পাবেন বয়স্ক ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্নরা
ঈদের ছুটিতেও খোলা যেসব এলাকার ব্যাংক
তামাক নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ প্রশংসনীয়
জলঢাকায় ইউএনও মাঠে নামতেই উধাও যানজট
আদর্শ প্রজন্ম গঠনে প্যারিসে এমসি ইনস্টিটিউটের ব্যতিক্রমী আয়োজন
টুংটাং শব্দে মুখরিত বেনাপোলের কামারপল্লী
আমতলীতে জাহানারা লতিফ মোল্লা ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ‘ভালোবাসার দোকান’
রায়পুরায় নিজ প্রতিষ্ঠানে ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হত্যা
লালগালিচার ঝলক পেরিয়ে শেষ হলো কান উৎসবের ৭৯তম আসর