সেনাবাহিনীকে বিতর্কমুক্ত রাখাই রাষ্ট্রের স্বার্থ
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কেবল একটি সশস্ত্র বাহিনী নয়; এটি দেশের নিরাপত্তা, আত্মত্যাগ, শৃঙ্খলা ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের এক অবিচ্ছেদ্য প্রতীক। মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রাজনৈতিক সংকট কিংবা রাষ্ট্রীয় ক্রান্তিলগ্ন—প্রতিটি পর্যায়ে সেনাবাহিনীর ভূমিকা ইতিহাসে সুস্পষ্ট ও গৌরবোজ্জ্বল। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, থেকে সাম্প্রতিক জুলাই গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত জনগণের পাশে দাঁড়িয়ে সেনাবাহিনী বারবার প্রমাণ করেছে, তারা রাষ্ট্রের নয়—জনগণের শক্তি।
তবে ইতিহাসের এ উজ্জ্বল ধারার বিপরীতে একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতাও রয়েছে। দেশি-বিদেশি একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরেই পরিকল্পিতভাবে সেনাবাহিনীকে বিতর্কিত করতে, হেয় করতে এবং রাজনৈতিক সংঘাতে টেনে আনার অপচেষ্টায় লিপ্ত। পিলখানা ট্রাজেডি ছিলো সে ষড়যন্ত্রের এক ভয়াবহ দৃষ্টান্ত। সাম্প্রতিক সময়েও দেখা যাচ্ছে, কিছু ব্যক্তি ও রাজনৈতিক পক্ষ দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্যের মাধ্যমে সেনাবাহিনীকে বিতর্কের কেন্দ্রে টেনে আনছেন—যা রাষ্ট্রের জন্য গভীরভাবে উদ্বেগজনক।
ঢাকা-১৭ আসনে জামায়াত সমর্থিত প্রার্থী ডা. খালিদুজ্জামানের একটি ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া সে উদ্বেগকে আরও জোরালো করেছে। সেনানিবাসের গেটে দায়িত্বরত সেনা সদস্যদের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে অশোভন ও অসৌজন্যমূলক মন্তব্য কোনওভাবেই একজন শিক্ষিত নাগরিক বা সংসদ সদস্য পদপ্রার্থীর কাছ থেকে প্রত্যাশিত নয়। বিষয়টি ব্যক্তিগত আচরণের সীমা ছাড়িয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা প্রশ্নবিদ্ধ করার পর্যায়ে পৌঁছেছে।
এ কথা সত্য, অতীতে সেনাবাহিনীর কিছু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার কারণে ফ্যাসিবাদী শাসন দীর্ঘায়িত হয়েছিলো এবং গুম, খুন, অপহরণসহ নানা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছিলো। কিন্তু সে দায় পুরো সেনাবাহিনীর ওপর চাপিয়ে দেয়া যেমন অবিচার, তেমনি বিপজ্জনকও। কারণ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সার্বিক চিত্র এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিপরীতে, দেশের দুর্যোগে ত্রাণকর্তা হিসেবে ঝাঁপিয়ে পড়া, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের মর্যাদা সমুন্নত রাখা—এসবই সেনাবাহিনীর প্রকৃত পরিচয়।
আরও পড়ুন <<>> পতাকা নামলো শহীদ আনাসের কবর থেকে
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে যখন দেশ এক সংবেদনশীল সময় অতিক্রম করছে, তখন সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্ব সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। নির্বাচন বানচাল করতে বা দীর্ঘায়িত করতে একটি দেশি-বিদেশি চক্র যে সক্রিয়—তা অস্বীকার করার উপায় নেই। এমন বাস্তবতায় সেনাবাহিনীকে উদ্দেশ্য করে উসকানিমূলক বক্তব্য বা রাজনৈতিক ট্যাগ লাগানোর চেষ্টা সে ষড়যন্ত্রকেই শক্তিশালী করে।
প্রধান উপদেষ্টা ও সেনাপ্রধান বারবার অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সেনাবাহিনীর ইতিবাচক ভূমিকা ইতোমধ্যে দৃশ্যমান। এ অবস্থায় কোনও সংসদ সদস্য প্রার্থী বা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য শুধু শিষ্টাচার লঙ্ঘন নয়; এটি রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার জন্যও হুমকি।
দেশ আমাদের, সেনাবাহিনীও আমাদের। রাজনৈতিক মতাদর্শ, দলীয় স্বার্থ বা ভোটের অঙ্ক যেনো কখনোই সেনাবাহিনীর মতো জাতীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনগণের আস্থা ও সম্মানে ফাটল ধরাতে না পারে—সেদিকে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে। সেনাবাহিনীকে বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখা শুধু বাহিনীর স্বার্থ নয়; এটি রাষ্ট্র, গণতন্ত্র এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের স্বার্থ।
৬ ফেব্রয়ারি ২০২৬
সম্পাদক




























