সরকারি কর্মচারী অধ্যাদেশ বাস্তবায়ন: মূল্যবোধের বিপ্লবের সূচনা
বাংলাদেশের সমাজে এক গভীর অসুস্থতা ক্রমেই অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে—এটা শুধু দুর্নীতি নয়, বরং দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার এক দীর্ঘ চর্চিত কৌশল। রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত সরকারি প্রশাসন কাঠামো যখন জনগণের শত্রুতে রূপ নেয়, তখন নাগরিক সমাজ শুধু বিপন্ন হয় না, তার নৈতিক ভিত্তিও ভেঙে পড়ে। এ অবস্থায় ‘সরকারি কর্মচারী অধ্যাদেশ ২০২৪’-এর দ্রুত বাস্তবায়ন হতে পারে একটি নীতিনিষ্ঠ সমাজ প্রতিষ্ঠার পথচিত্র।
এ অধ্যাদেশের মূল বার্তাটি সরল: জনগণের অর্থে নিযুক্ত কর্মচারীরা জনগণের সেবক—মালিক নয়। রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের ভূমিকা দায়িত্বশীলতার, ক্ষমতার নয়। যদি একজন সরকারি কর্মচারী সত্যিই সৎ, দক্ষ, দায়িত্ববান ও জনগণের সেবায় নিবেদিত হন, তবে এ অধ্যাদেশ তার কাজের পথে বাধা নয়, বরং সহায়কই হবে।
তবুও প্রশ্ন জাগে—
তাহলে কেনো এখনও সরকারি কর্মচারীদের একটা অংশ এ অধ্যাদেশের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামছেন? কেন তারা একে তাদের ‘অধিকার হরণের চেষ্টা’ হিসেবে দেখছেন? জনগণের মনে এমন প্রশ্ন উঠে আসাটাই স্বাভাবিক। প্রকৃতপক্ষে, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে এক শ্রেণির কর্মচারী এতদিন ধরে যে অপসাংস্কৃতিক বলয়ে নিজেদের ঢেকে রেখেছিলো, এ অধ্যাদেশে তারা সে ক্ষমতা হারানোর আতঙ্কে শঙ্কিত। কারণ, তারা অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন ঘুষকে প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম বানিয়ে ফেলার। তারা নিজেরাই নিজেদের জনগণের মালিক ভেবে বসেছেন। এমনকি কিছু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা তো এতটাই দম্ভে ভুগছেন যে মালিক-জনগণকে শাস্তি দেয়ার ক্ষমতার দম্ভে কথা বলেন!
মালিক কে? প্রভু কে?
আমরা কি ভুলে গেছি, বাংলাদেশের সংবিধান বলছে—‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ’? তাহলে যারা জনগণের করের অর্থে বেতন নেন, যাদের গাড়ি-ঘর-অফিস জনগণের পয়সায় চলে, তারা কীভাবে প্রভু হয়ে ওঠেন? এ ব্যবস্থার আমূল সংস্কার না হলে রাষ্ট্র কখনো জনগণের কাঙ্ক্ষিত রূপ লাভ করবে না।
এখানে অধ্যাদেশটি বাস্তবায়নের গুরুত্ব আসে। এটিকে কেবল আইনি সংস্কার মনে করলে ভুল হবে; এটি একটি সামাজিক মূল্যবোধ পুনর্গঠনের উদ্যোগ। এটি এক ধরনের মূল্যবোধের বিপ্লব, যেখানে সেবা হবে অধিকারের প্রতিফলন, দায়িত্ব হবে গর্বের, আর ঘুষ-দুর্নীতি হবে ঘৃণার বিষয়।
শাস্ত্র-নৈতিকতা-মানবতা—সবই বিরুদ্ধ
ইসলাম থেকে শুরু করে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান—সব ধর্মেই ঘুষ ও অন্যায়ভাবে উপার্জিত অর্থ গ্রহণ করা হারাম বা পাপ বলে বিবেচিত। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণেও এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। নৈতিকতার প্রশ্নে এ এক মারাত্মক লঙ্ঘন। কিন্তু এ সমাজে এখন নীতি ধরলে লজ্জা, ঘুষ ধরলে মর্যাদা! অর্থের গরমে কিছু সরকারি কর্মচারী সমাজে ক্ষমতাধরের প্রতীক হয়ে ওঠে, আর সৎ ব্যক্তি হতে হয় কটাক্ষের পাত্র।
এখনই সময় — বদল আনতে হবে
যে অধ্যাদেশটি বর্তমানে কার্যকর করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, সেটি একমাত্র সরকার নয়, গোটা জাতির স্বার্থে। আমাদের সবাইকে—সরকারি ও বেসরকারি কর্মকর্তা, রাজনীতিবিদ, নাগরিক সমাজ, সাংবাদিক, বিচারক, শিক্ষক, এমনকি ছাত্রসমাজ—এ সংস্কারের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
এ আইন শুধু প্রশাসনের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনবে না, বরং নাগরিকদের মাঝে একটি বার্তা পৌঁছাবে—আমার রাষ্ট্র আমাকে শ্রদ্ধা করে, আমার শ্রমের মূল্য দেয়, আমার ঘুষ না দিয়েও ন্যায্য সেবা পাওয়ার অধিকার আছে।
আরও পড়ুন <<>> প্রভাবমুক্ত আইনের প্রয়োগই শান্তির সোপান
বাংলাদেশের ইতিহাসে বহুবার নীতির কথা বলা হয়েছে, দুর্নীতি দমনের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে, কিন্তু বাস্তবায়নের অভাবে সবই থেকেছে ফাঁকা বুলি। এবার সময় এসেছে কথার চেয়ে কাজে বিশ্বাস রাখার। যত বাধাই আসুক, সরকারি কর্মচারী অধ্যাদেশ বাস্তবায়ন করতেই হবে। এটি শুধু প্রশাসনিক সংস্কার নয়, এটি সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্ন। মূল্যবোধের প্রশ্ন। নতুন প্রজন্মের ভবিষ্যতের প্রশ্ন।
তাই আসুন, আমরা সকলে—চাকরিজীবী হই বা না হই—এই অধ্যাদেশের পক্ষে দাঁড়াই। দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিই। রাষ্ট্রকে সেবার সংস্কৃতি উপহার দিই। তাহলেই সমাজ থেকে অনাচার দূর হবে, মানুষের মর্যাদা ফিরে আসবে, এবং আমরা এক উন্নততর বাংলাদেশ গড়তে পারব ইনশাআল্লাহ।
লেখক:
এম এম এ শাহজাহান, প্রকৌশলী
মার্কেটিং অ্যাডভাইজার, ফাইন গ্রুপ।




























