ডিপ্লোমা-ডিগ্রি ইঞ্জিনিয়ারিং দ্বন্দ্ব, সূরাহা কোন পথে?
১৮৭৬ সাল থেকে এইদেশে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্স চালু রয়েছে। ১৯৪৯ সালে পূর্ব পাকিস্তানে প্রথম আহসানুল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ (বর্তমান বুয়েট)-এ ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রী চালু হয়। বুয়েটে পাশাপাশি চলতে থাকে ডিপ্লোমা ও বিএসসি কোর্স। ১৯৫৬ সালে বুয়েটে পুরোপুরি ডিপ্লোমো কোর্স বন্ধ করে দেয়া হয়।
১৯৪৯ সাল থেকেই ডিপ্লোমাকে ছোট করা, পদবী অবনয়ন করতে চাওয়া, উচ্চশিক্ষার সুযোগ বন্ধ করা, ইঞ্জিনিয়ারিং উপাধি কেড়ে নেয়াসহ একের পর এক ষড়যন্ত্র শুরু হয়। তৎকালীন সময়ে আমেরিকার ওকলামা স্টেট ইউনিভার্সিটি স্টান্ডার্ডে পরিচালিত ডিপ্লোমা কোর্সের সাথে গ্রাজুয়েশন কোর্সের তখন খুব বেশি পার্থক্য ছিলো না। এক শ্রেণীর কারিগরি আমলার শ্রেণী বিদ্বেষ জনিত চিন্তাভাবনার ফলস্বরূপ ডিপ্লোমার পদ অবনয়ন করা হয় এবং গ্রাজুয়েটদের পদের সুযোগ-সুবিধার মাঝে বিশাল পার্থক্য সৃষ্টি করা হয়। প্রতিবাদে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়াররা রাজপথে আন্দোলন করলে; ১৯৫১ সালে পাকিস্তানি পুলিশের গুলিতে অনেকে আহত হন, অনেকে চাকরিচ্যুত হন। ১৯৫৩, ১৯৬৭ সালেও ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়াররা আন্দোলন করে।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের বঞ্চনার অবসান ঘটেনি, আন্দোলন চলতেই থাকে। দীর্ঘ সময়ের আন্দোলন এবং ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের অবদানের স্বীকৃতি স্বরুপ ১৯৭৮ সালে শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের সহকারী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি ৩৩% এবং সিলেকশন গ্রেড ৫০% নির্ধারণ করেন। যদিও এর আগেই PDB, PWD, BWDB-এ অনেক ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার পদোন্নতি পেয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী পদেও কর্মরত ছিলেন।
দীর্ঘ আন্দোলনের পরে জিয়াউর রহমান ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের উপ-সহকারী প্রকৌশলীদের একটি কাঠামোতে নিয়ে আসেন এবং ১৯৮০ সালে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ (বর্তমান ডুয়েট) প্রতিষ্ঠা করেন।
শ্রেণী বিদ্বেষের জন্য কারিগরি আমলারা তাদের ষড়যন্ত্রের জাল বুনতেই থাকেন। তাদেরই ইন্ধনে এরশাদ সরকারের শাসনামলেও হায়ার ডিপ্লোমা চালুর ষড়যন্ত্র করা হয়। কিন্তু ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়াররা আন্দোলন শুরু করলে; এরশাদের শাসনামলে ৮বছরে অনেক ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার আহত হয়, কারাবরণ করে, ছাত্রত্ব বাতিল হয়। এরশাদের আমলে পলিটেকনিক ৫-৬সেশন ধরে লাগাতার বন্ধ ছিলো।
আরও পড়ুন <<>> সরকারি কর্মচারী অধ্যাদেশ বাস্তবায়ন: মূল্যবোধের বিপ্লবের সূচনা
৯০ এর গণ আন্দোলনে স্বৈরাচার এরশাদ শাহীর পতন ঘটলে জাতি গঠনে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের অবদান এবং বাস্তবতা যাচাই করে অবশেষে ১৯৯৪ সালে বেগম খালেদা জিয়া সরকার উপ-সহকারী প্রকৌশলী পদকে দ্বিতীয় শ্রেণীর মর্যাদা প্রদান করেন।
পরবর্তীতে আবারও যখন গ্রাজুয়েট ইঞ্জিনিয়ারেরা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে উপ-সহকারী প্রকৌশলীদের পদোন্নতি বন্ধ করা, উক্ত পদে ডিগ্রি ইঞ্জিনিয়ারদের সুযোগ প্রদানের দাবী জানালেও; আওয়ামী লীগ সরকার বার বার সে দাবী প্রত্যাখান করে। বরং তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকার অস্ট্রেলিয়ান মডেল অনুযায়ী কারিকুলাম আধুনিকায়ন করে ডিপ্লোমাকে চার বছরে উন্নীত করেন। শত বাঁধার পরেও সকল সুবিধা অক্ষুন্ন রাখেন এবং ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের সরাসরি চীনে গ্রাজুয়েশন করার সুযোগও সৃষ্টি করেন। সবকিছুই সময়ের ধারা অনুসারে চলছিলো ।
শেখ হাসিনা সরকার বিগত ১৭ বছর দুঃশাসন করে স্বৈরাচারের ভূমিকায় আবির্ভূত হয় । ফলশ্রুতিতে পুরো জাতির রোষানলে পড়ে ছাত্র জনতা কর্তৃক গণঅভ্যুত্থানের মধ্যে তার সরকার ২০২৪ এর ৫ ই আগস্ট সদলবলে ভারতে পালিয়ে যায় এবং গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার দেশের শাসনভার গ্রহণ করে।
এখন আবার নতুন করে শ্রেণী দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছে, হঠাৎ করেই ডিগ্রী ইঞ্জিনিয়ারিং এ প্রকৌশল ছাত্ররা বিশেষ করে বুয়েট থেকে তারা ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের ১০ম গ্রেডের পদটি তাদের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে বলে। প্রকারান্তরে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং এর প্রকৌশল ছাত্রবৃন্দ এর বিরোধিতা করে যাচ্ছে। তাদের উভয় পক্ষের আন্দোলনে দেশ এখন প্রকম্পিত।
প্রশ্ন হচ্ছে সমাধান কোথায়?
হাজার হাজার বিএসসি এবং ডিপ্লোমা প্রকৌশলী সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি বজায় রেখে সার্ভিসরুল মেনে ৯ম ও ১০ম গ্রেডে সুনামের সাথে চাকরি করছেন। তাদের মধ্যে এসব নিয়ে কোন মতবিরোধ নেই যতটা বিরোধ, বৈষম্য অলৌকিকভাবে আবিষ্কার করেছেন আমাদের অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা। বৈষম্যমূলক আচরণ থাকলে সবার আগে কর্মরতরাইতো অফিসিয়ালী আওয়াজ উঠাতো, কই? তাতো আমরা দেখলামনা।
তাহলে চলমান হিংসা, বিদ্বেষ এসব কি উদ্দেশ্যমূলক নয়? মায়ের চেয়ে মাসীর দরদ বেশী হয়ে গেলো না? এই যে মাসীরা, যারা পিছনে থেকে এ ঝামেলার মাস্টারমাইন্ড হিসেবে কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন, তাদেরকে কঠোর হস্তে দমন করার মাধ্যমেই অন্তবর্তী সরকারকে এ ঘটনার সুরাহা করতে হবে।
সবার দেশ/কেএম




























