পাল্টা তোপ দুই পক্ষের
জামায়াত-এনসিপি দ্বন্ধ চরমে, গোলাম পরওয়ারের মন্তব্যে ক্ষুব্ধ এনসিপি
বাংলাদেশের অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের মিত্র দুই দল—জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)—এখন প্রকাশ্য দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছে। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের সাম্প্রতিক বক্তব্যকে ‘অসৌজন্যমূলক ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ’ বলে আখ্যা দিয়েছে এনসিপি। অপরদিকে জামায়াত বলছে, গোলাম পরওয়ারের মন্তব্য ছিলো ‘স্নেহভরা পরামর্শ’ মাত্র।
ঘটনার সূত্রপাত এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের এক ফেসবুক পোস্ট থেকে। তিনি লেখেন,
জামায়াতে ইসলামী পিআর পদ্ধতি নিয়ে যে তথাকথিত আন্দোলন শুরু করেছিল, আসলে সেটি ছিল এক সুচিন্তিত রাজনৈতিক প্রতারণা।
তার দাবি, ঐ আন্দোলনটি পরিকল্পিতভাবে করা হয়েছিলো ঐকমত্য কমিশনের সংস্কার প্রক্রিয়া ও জাতীয় আলোচনাকে গণ-অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র ও সংবিধান পুনর্গঠনের আসল প্রশ্ন থেকে ভিন্ন খাতে সরিয়ে দিতে।
নাহিদ ইসলামের এ মন্তব্যের পর জামায়াতে ইসলামী তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়। দলের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আজাদ বলেন, কোনও দলের বিষয়ে মন্তব্য করতে গেলে রাজনৈতিক শিষ্টাচার বজায় রাখা উচিত।
তবে বিতর্ক আরও ঘনীভূত হয় সাতক্ষীরায় এক দলীয় সমাবেশে মিয়া গোলাম পরওয়ারের বক্তব্যকে ঘিরে। সেখানে তিনি বলেন,
একটা দল ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে বলেছে আমরা সংস্কার, অংশীদারির রাজনীতি বা অভ্যুত্থানে কোনও ভূমিকা রাখিনি। আরে বাবা, তোমরা নতুন ছাত্রদের দল, রাজনীতিতে জামায়াতের সঙ্গে পাল্লা দিতে গেলে এখনও অনেক দূর যেতে হবে। জন্ম নিয়েই বাপের সঙ্গে পাল্লা দিও না।
পরওয়ার আরও বলেন,
ওনারা চাচ্ছেন আমরা ওনাদের সমালোচনা করি, কিন্তু আমরা তো ওনাদের নামই নিই না। জামায়াতের মতো বড় দল হিসেবে আমরা এমন কাউকে তেমন আমলে নিই না। রাজনীতিতে ম্যাচিউরিটি বোঝার জন্য এখনও অনেক দূর যেতে হবে।
এ বক্তব্যেই ক্ষোভে ফেটে পড়ে এনসিপি। দলের যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন বলেন,
ওই বক্তব্য শুধু অসৌজন্যমূলক নয়, রাজনৈতিক ঔদ্ধত্যপূর্ণও বটে। বয়সে তিনি আমাদের বাবা-দাদার সমান, এমন মন্তব্য তার মতো সিনিয়র রাজনীতিবিদের মুখে মানায় না।
এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব আরও একধাপ এগিয়ে বলেন, রাজনীতিতে কারও বাপ হইতে চাওয়া মানসিক বিকার। গণ-অভ্যুত্থান সবার বাপ, কারণ এনসিপির জন্ম সে অভ্যুত্থানেরই ধারাবাহিকতায়। তখন সবাই অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব মেনে একসঙ্গে আন্দোলন করেছে। বিপদের সময় এক কমান্ডে কাজ করে, বিপদ কেটে যাওয়ার পর নিজেদের কমান্ডার দাবি করা এক ধরনের রাজনৈতিক বালখিল্যতা।
এদিকে জামায়াতে ইসলামী তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করে বলছে, বিষয়টি অতিরঞ্জিত করা হচ্ছে। দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসান মাহবুব জোবায়ের জানান, গোলাম পরওয়ার সাহেব কোনও দলের নাম বলেননি। স্নেহের অবস্থান থেকেই তিনি কিছু কথা বলেছেন। আমরা সবাই ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের সহযোদ্ধা এবং দেশ গঠনে একসঙ্গেই কাজ করছি।
২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অভ্যুত্থানপন্থি রাজনৈতিক সমন্বয়কারীদের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামী নিবিড়ভাবে কাজ করেছিলো। তখন থেকেই এনসিপির শীর্ষ নেতারা জামায়াতের প্রতি সহানুভূতিশীল মনোভাব দেখিয়ে আসছিলেন। এমনকি নাহিদ ইসলামের এক মন্তব্য—অভ্যুত্থানে অংশ নিয়ে জামায়াতের কাফফারা হয়ে গেছে—রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দেয়।
পরে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে এনসিপি দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলে দুই দলের সম্পর্ক তখনও বন্ধুত্বপূর্ণ ছিলো। উভয় দলই ঐকমত্য কমিশন ও সংসদের প্রস্তাবিত উচ্চকক্ষের জন্য পিআর (প্রোপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন) পদ্ধতি সমর্থন করেছিলো। কিন্তু সাম্প্রতিক ফেসবুক পোস্ট ও পাল্টা বক্তব্যে সে সম্পর্ক এখন দৃশ্যত টানাপড়েনে পৌঁছেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মিয়া গোলাম পরওয়ারের বক্তব্য আসলে পুরনো ইসলামী রাজনীতির নেতৃত্ব ধরে রাখার মনোভাবের প্রতিফলন। অন্যদিকে এনসিপি নিজেকে নতুন প্রজন্মের প্রগতিশীল ইসলামি রাজনীতির প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে। ফলে জামায়াত-এনসিপি দ্বন্দ্ব কেবল মন্তব্যের লড়াই নয়, বরং ইসলামি রাজনীতির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব কে দেবে—তা নিয়েও এক প্রকার শক্তি-পরীক্ষা শুরু হয়েছে।
সবার দেশ/কেএম




























