নিখোঁজ পাঁচ শতাধিক পর্যটক
ভয়াবহ বন্যায় তছনছ নেপাল, নিহত দেড় শতাধিক
নেপাল ও তিব্বত সীমান্তসংলগ্ন রসুয়া জেলায় আকস্মিক বন্যা, পাহাড়ধস ও তুষারধসে ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বুধবার (২৬ আগস্ট) আকস্মিক এ দুর্যোগে এখন পর্যন্ত অন্তত দেড় শতাধিক নিহত হয়েছেন। নিখোঁজ রয়েছেন শত শত মানুষ, যাদের মধ্যে বিপুলসংখ্যক বিদেশি পর্যটক রয়েছেন।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ও পুলিশের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, দুর্যোগের পর রসুয়া জেলাকে দুর্যোগকবলিত এলাকা ঘোষণা করা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ এবং হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
সোশ্যাল মিডিয়ায ছড়িয়ে পড়া এবং যাচাই করা সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, পাহাড়ি এলাকা থেকে মুহূর্তের মধ্যে বিপুল পরিমাণ মাটি, পলি ও পানির স্রোত নেমে আসছে। মানুষ প্রাণ বাঁচাতে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করছেন। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই কালো মাটি ও পলির বিশাল স্রোত পুরো এলাকা ঢেকে ফেলে।
নেপাল ট্যুরিজম বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বন্যার পর ৫ শতাধিক এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের মধ্যে ৬১ জন নেপালি এবং ৩৪১ জন বিদেশি নাগরিক। নিখোঁজ বিদেশিদের মধ্যে ভারতের ১৩৩ জন, যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭ জন এবং যুক্তরাজ্যের ৩৩ জন রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে ২০০ জন নারী ও ২০৩ জন পুরুষ। ধারণা করা হচ্ছে, নিখোঁজ ব্যক্তিরা ২৬টি দেশের নাগরিক।
তবে পর্যটন বোর্ডের আরেক হিসাব অনুযায়ী, বন্যাকবলিত এলাকা থেকে ৩৮৪ জন পর্যটক নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের মধ্যে ২৯১ জন বিদেশি এবং ৯৩ জন নেপালি নাগরিক। বিদেশি নিখোঁজদের মধ্যে ১০৫ জন ভারতীয় নাগরিক বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
বন্যায় নুয়াকোট ও ধাদিং জেলার বিস্তীর্ণ এলাকাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভোতেকোশি নদীতে হঠাৎ পানির প্রবল স্রোত তৈরি হয়ে আশপাশের এলাকা ভাসিয়ে নিয়ে যায়। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিব্বতের সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে নেমে আসা পানির ঢল এ আকস্মিক বন্যার অন্যতম কারণ হতে পারে।
রসুয়া জেলায় নেপাল পুলিশের অন্তত ২৬ সদস্য এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। দেশটির সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী জানিয়েছে, তাদের সাত সদস্যেরও কোনও সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না।
দুর্যোগের পর উদ্ধার তৎপরতা জোরদার করেছে নেপাল সরকার। নেপাল সেনাবাহিনী হেলিকপ্টার ও দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রশিক্ষিত দল পাঠিয়েছে। সেনাবাহিনীর এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি নিখোঁজদের উদ্ধারে অভিযান চলছে।
কাঠমান্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রিজন ভক্ত কায়স্থের বরাত দিয়ে কাঠমান্ডু পোস্ট জানিয়েছে, প্রাথমিক মূল্যায়নে একটি বরফধসের কারণে লেন্দে নদীর গতিপথ আটকে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। পরে সে বাধা ভেঙে পানির প্রবল স্রোত তৈরি হয়ে ভোতেকোশি নদীতে আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হতে পারে। ভোতেকোশি নদী লেন্দে নদীর একটি উপনদী।
এদিকে চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, নেপাল সীমান্তের কাছাকাছি তিব্বত অংশেও ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে। ওই ভূমিধসের প্রভাব জিরং বন্দরে পড়ে। এতে নেপাল সীমান্তবর্তী চীনের শিগাতসে অঞ্চলের সড়ক, যোগাযোগব্যবস্থা ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
তিব্বতের কর্মকর্তারাও সীমান্তবর্তী গিরং এলাকায় বড় ধরনের প্রাণহানির আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল বুধবার দেশটির পার্লামেন্টে জানিয়েছেন, একটি ভূমিকম্পের কারণে তুষারধস বা পাহাড়ধসের সৃষ্টি হয়ে বন্যার সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে।
বন্যার পানির স্রোতে নেপালের বিভিন্ন এলাকায় ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু ও বিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত বা পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে। ফলে দুর্গত অনেক এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
রয়টার্স জানিয়েছে, দুর্গত এলাকায় এখনো উদ্ধার অভিযান চলছে। সীমান্তবর্তী এলাকায় ধারণ করা ভিডিওতে বহু মানুষকে পানির প্রবল স্রোতে ভেসে যেতে দেখা গেছে। নেপাল ও চীনের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আশঙ্কা করছে, উদ্ধার অভিযান এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
সবার দেশ/কেএম




























