আজ পবিত্র হজ: লাব্বাইক ধ্বনিতে মুখরিত আরাফাত ময়দান
আজ ৯ জিলহজ, পবিত্র হজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিন। লাখো মুসলমান ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ ধ্বনিতে মুখরিত করে তুলেছেন সৌদি আরবের পবিত্র আরাফাতের ময়দান। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত তারা অবস্থান করছেন এ ময়দানে—যা হজের মূল ও আবশ্যিক রোকন হিসেবে গণ্য।
আরাফা হজের কেন্দ্রবিন্দু”—রাসুল (সা.)
রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন, হজ মানেই আরাফাতে অবস্থান (মুসনাদে আহমদ)। আর তাই আজকের এ আরাফার দিন মুসলিম উম্মাহর জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। লাখো হাজী আজ কিবলামুখী হয়ে দু’হাত তুলে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইবেন, দোয়া করবেন নিজের, প্রিয়জন ও গোটা উম্মাহর জন্য।
আরাফা, মুজদালিফা ও মিনায় ধারাবাহিক ইবাদত
এর আগে মঙ্গলবার রাতেই হাজীরা এহরাম বেঁধে মিনা অভিমুখে যাত্রা করেন। বুধবার সকালে ১৫ লাখেরও বেশি হজযাত্রী মিনার তাঁবু নগরীতে পৌঁছান। আর আজ বৃহস্পতিবার (৯ জিলহজ) ভোর থেকেই তারা যাত্রা করেন আরাফাতে।
খুতবার পর জোহর ও আসরের নামাজ একসঙ্গে আদায়ের পর হাজীরা আল্লাহর দরবারে লিপ্ত হন ইবাদতে—জিকির, ইস্তিগফার ও কাঁদো কাঁদো দোয়ায়। এ সময় হাজীরা আল্লাহর ৯৯টি নাম, দরুদে ইবরাহিম, তালবিয়া ও তাকবির পাঠ করেন।
সন্ধ্যার পর হাজীরা আরাফাত থেকে রওনা হবেন মুজদালিফার উদ্দেশ্যে। সেখানে তারা রাত যাপন ও মিনায় শয়তানকে নিক্ষেপ করার জন্য পাথর সংগ্রহ করবেন। ১০ জিলহজ ভোরে তারা মিনায় ফিরে বড় শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করবেন, কোরবানি দিবেন এবং কাবা শরিফে তাওয়াফ ও সাফা-মারওয়া সায়ী সম্পন্ন করবেন। পরবর্তী দুই দিন মিনায় অবস্থান করে তিনটি জামারায় ২১টি পাথর নিক্ষেপ করবেন হাজীরা। বিদায়ী তাওয়াফের মধ্য দিয়ে শেষ হবে হজের আনুষ্ঠানিকতা।
বিশ্বের ২৬ লাখ মুসলমান, বাংলাদেশি ৮৭ হাজারের বেশি
সৌদি সরকারের দেওয়া তথ্যমতে, এবারে হজে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত ২৬ লাখের বেশি মুসলমান অংশ নিচ্ছেন। এদের মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশ থেকে যাওয়া ৮৭ হাজার ১৫৭ জন হজযাত্রী, যারা ২২৪টি ফ্লাইটে সৌদি আরবে পৌঁছেছেন।
বাংলাদেশ হজ অফিস জানিয়েছে, হজ পালনে গিয়ে এ পর্যন্ত বাংলাদেশি ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে, যাদের মধ্যে রয়েছেন এক নারী।
গরম মোকাবিলায় সৌদি আরবের বিশেষ প্রস্তুতি
২০২৪ সালের হজ মৌসুমে অতিরিক্ত গরমে শতাধিক হাজীর মৃত্যু হওয়ায় এবার নেওয়া হয়েছে ব্যাপক সতর্কতা। সৌদি হজমন্ত্রী জানিয়েছেন, এবার আরাফাত ও মিনায় ৫০ হাজার বর্গমিটার ছায়াযুক্ত এলাকা প্রস্তুত করা হয়েছে। মোতায়েন করা হয়েছে চার শতাধিক শীতলীকরণ ইউনিট, হাজার হাজার চিকিৎসক ও সেবাকর্মী। কাজ করছে ৪০টির বেশি সরকারি সংস্থা, মোট কর্মকর্তা-কর্মচারী আড়াই লাখ।
হজের খুতবা দিচ্ছেন ড. সালেহ বিন হুমাইদ
আজ আরাফাতের ময়দানে অবস্থিত ঐতিহাসিক মসজিদে নামিরাহ থেকে হজের খুতবা প্রদান করছেন মক্কার পবিত্র মসজিদুল হারামের ইমাম ও খতিব শায়খ ড. সালেহ বিন হুমাইদ। এ খুতবা সরাসরি সম্প্রচারিত হচ্ছে এবং বাংলাসহ মোট ২০টি ভাষায় অনূদিত হচ্ছে।
হজ করে নিষ্পাপ হয়ে ফিরুন”—বুখারির হাদিস
হজের গুরুত্ব সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন: যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হজ করে এবং অশ্লীল ও গুনাহের কাজ থেকে বিরত থাকে, সে নবজাতকের মতো নিষ্পাপ হয়ে ফেরে। (বুখারি ১/২০৬)
হজের প্রতিটি আনুষ্ঠানিকতা—কাবা শরিফ তাওয়াফ, সাফা-মারওয়ার সায়ী, আরাফাতের ময়দানে অবস্থান, জামারায় পাথর নিক্ষেপ এবং পশু কোরবানি—সবকিছুই আমাদের শিক্ষা দেয় ত্যাগ, আনুগত্য, ও পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণের আদর্শ।
আজকের এ আরাফার দিন শুধু হাজীদের জন্যই নয়, সারা বিশ্বের মুসলমানদের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ। এ দিন রোজা রাখা, অধিক ইবাদত করা ও গোনাহ মাফ চাওয়ার বিশেষ তাগিদ রয়েছে হাদিসে।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে হজের শিক্ষা আত্মস্থ করে আমৃত্যু তার আনুগত্যে থাকা ও জান্নাতের পথে চলার তাওফিক দিন। আমিন।
সবার দেশ/কেএম




























