গাজার মসজিদ ধ্বংসে নীরব বিশ্ব, গির্জায় আঘাতেই তোলপাড় কেন?
গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসন এখন আর শুধুমাত্র সামরিক সংঘর্ষ নয়, এটি হয়ে উঠেছে ধর্মীয় স্থাপনা ও বিশ্বাসের বিরুদ্ধে এক পক্ষপাতদুষ্ট বিশ্বনীতির প্রতিচ্ছবি। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর শুরু হওয়া ইসরায়েলি অভিযান এখন পর্যন্ত গাজার ৮০ শতাংশেরও বেশি এলাকা ধ্বংস করে ফেলেছে, যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মসজিদ—ইসলামী সভ্যতার পবিত্র ও ঐতিহাসিক প্রতীক।
স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ বলছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত ইসরায়েলি হামলায় ৫৮০টির বেশি মসজিদ সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস হয়েছে। এর মধ্যে ৩১০টি মসজিদে এখন আর নামাজ আদায় সম্ভব নয়। বহু মসজিদ অটোম্যান আমলের—দুই শত বছরের বেশি পুরনো। বহু নারী, শিশু ও বৃদ্ধ নিহত হয়েছেন যখন তারা এ মসজিদগুলোতে আশ্রয় নিয়েছিলেন।
তবু বিশ্ব ছিল নীরব।
হঠাৎ এ নীরবতা ভেঙে যায় ২০২৫ সালের ১৭ জুলাই, যখন গাজার একমাত্র ক্যাথলিক গির্জা ‘হলি ফ্যামিলি চার্চে’ ইসরায়েলি শেল আঘাত হানে। এতে তিনজন নিহত হন, আহত হন অনেকে, যার মধ্যে আছেন যাজক গ্যাব্রিয়েল রোমানেল্লিও। ঘটনাটিকে লক্ষ্যভ্রষ্ট শেল বললেও ইসরায়েল তদন্তের আশ্বাস দেয়। এ ঘটনার পরপরই যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, নেতানিয়াহু আমাকে হতাশ করেছে, তিনি এখন সীমা ছাড়িয়ে গেছেন। রিপাবলিকান সিনেটর র্যান্ড পলও ইসরায়েলি আগ্রাসনের সমালোচনায় মুখর হন।
প্রশ্ন উঠছে—৫৮০টি মসজিদ গুঁড়িয়ে দিলেও কেনো এ প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি? ধর্মীয় সংবেদনশীলতা কি শুধু গির্জা দেখলেই জাগে?
বিশ্বের সবচেয়ে পবিত্র ইসলামী স্থানগুলোর একটির ওপর এমন হামলার পরেও মুসলিম বিশ্বের অবস্থান যেন কেবল বিবৃতিতে সীমাবদ্ধ। বিশেষ করে সৌদি আরব, যাকে ইসলামের রক্ষক বলা হয়, তাদের পক্ষ থেকেও কোনও দৃশ্যমান কূটনৈতিক উদ্যোগ দেখা যায়নি। আন্তর্জাতিক কোনো জোট গঠন, বয়কট বা রাজনৈতিক চাপ—সবই অনুপস্থিত।
এ বৈপরীত্যকে অনেকে দেখছেন ধর্মীয় শ্রেণিবৈষম্য ও রাজনীতিকীকরণের প্রতিফলন হিসেবে। ইতিহাসবিদ ওয়াহিদ আব্দুল্লাহ বলেন, মসজিদ ধ্বংসে মুসলিম বিশ্ব চুপ থাকে, গির্জায় আঘাতে পশ্চিমা বিশ্ব সরব হয়—এটাই পক্ষপাতদুষ্ট বিশ্বনীতির প্রমাণ।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মিডল ইস্ট বিশেষজ্ঞ রবার্ট ম্যাকডোনাল্ড বলেন, গির্জা মার্কিন রাজনীতিতে ভোটব্যাংকের প্রতীক, কিন্তু মুসলিম মসজিদে রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা নেই—তাই প্রতিক্রিয়াও আসে না।

বিশ্বজুড়ে বিশিষ্ট নেতারা এ দ্বৈত আচরণের তীব্র সমালোচনা করেছেন।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান বলেন, ইসরায়েল কেবল মানুষ হত্যা করছে না, মুসলিম ইতিহাস ও সংস্কৃতিও মুছে দিচ্ছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি বলেন, গাজার প্রতিটি মসজিদের ধ্বংস একেকটি কালো অধ্যায়।
মিশরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যান্ড ইমাম শেখ আহমদ আল-তাইয়্যেব বলেন, গির্জায় আঘাতে পশ্চিমা বিশ্ব কাঁদে, মসজিদ ধ্বংসে তারা চুপ—এটাই আমাদের সময়ের নৈতিক সংকট।
যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিম ইতিহাসবিদ ড. ইয়াসির কাদী এ হামলাকে ‘সাংস্কৃতিক গণহত্যা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। ইসলামিক হেরিটেজ গবেষক ড. সালমা হামিদ বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মুসলিম কোনও ভূখণ্ডে এতো মসজিদ একসঙ্গে ধ্বংস হয়নি। এ নীরবতা আসলে এক ধরনের পরোক্ষ অনুমোদন।
বিশ্বখ্যাত বুদ্ধিজীবী নোয়াম চমস্কি বলেন, ইসরায়েল এখন শুধু হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে না, বরং একটি জাতির স্মৃতি মুছে দিচ্ছে।
ধর্মতত্ত্ববিদ ড. কারেন আর্মস্ট্রং বলেন, ধর্মীয় স্থাপনার ধ্বংস ইতিহাসের বিরুদ্ধে অপরাধ। কিন্তু আমরা এ অপরাধ বেছে বেছে দেখি। গাজার মসজিদ ধ্বংসের প্রতি এই আন্তর্জাতিক নীরবতা আমাদের মানবাধিকারের দ্বিমুখীতার নগ্ন বাস্তবতা তুলে ধরে।
সত্যিই, প্রশ্ন উঠে—একটি গির্জার দেয়ালে ক্ষত হলেই যদি বিবেক জেগে ওঠে, তাহলে ৫০০-র বেশি মসজিদ মাটির সঙ্গে মিশে গেলেও কেন নীরবতা? ধর্মীয় অনুভূতি কি সমান নয়?
গাজার প্রতিটি ধ্বংস হওয়া মসজিদই কেবল একটি স্থাপনা নয়, বরং একটি জাতির আত্মা, তার ইতিহাস ও সংস্কৃতির প্রতীক। আর সে আত্মার ওপর আঘাতের বিরুদ্ধে বিশ্বের সাড়া না থাকাটা—মানবিকতা নয়, এক নির্মম রাজনৈতিক হিসাব।
সবার দেশ/কেএম




























