চলতি বছরেই সরবরাহ
ইরানের জন্য প্রস্তুত রাশিয়ার ২০টি সুখোই-৩৫ যুদ্ধবিমান
রাশিয়ার তৈরি অত্যাধুনিক সুখোই-৩৫ (Su-35) যুদ্ধবিমানের প্রথম ব্যাচের উৎপাদন শেষ হয়েছে। ইরানের জন্য নির্ধারিত ২০টি যুদ্ধবিমান ইতোমধ্যে প্রস্তুত করা হয়েছে এবং চূড়ান্ত হস্তান্তরের আগে সেগুলো বর্তমানে রাশিয়ায় রাখা হয়েছে। আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে স্থবির থাকা ইরানের যুদ্ধবিমান আধুনিকায়ন কর্মসূচিতে এটি একটি বড় অগ্রগতি।
প্রতিরক্ষা বিষয়ক সাময়িকী মিলিটারি ওয়াচ ম্যাগাজিনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধবিমানগুলো রাশিয়ার কোমসোমলস্ক-অন-আমুর অ্যাভিয়েশন প্ল্যান্টে তৈরি হয়েছে। সরবরাহের আগ পর্যন্ত বিমানগুলোর সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় বহন করছে ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।
এ অগ্রগতি এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন গত বছরের শেষদিকে ফাঁস হওয়া রাশিয়ার সামরিক-শিল্প খাতের কিছু অভ্যন্তরীণ নথিতে ইরানের জন্য অন্তত ১৬টি সুখোই-৩৫ তৈরির তথ্য উঠে এসেছিলো। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ধাপে ২০টি যুদ্ধবিমান প্রস্তুত করা হয়েছে।
সুখোই-৩৫ রাশিয়ার অন্যতম আধুনিক চতুর্থ-প্রজন্ম প্লাস (4++) শ্রেণির মাল্টিরোল ফাইটার। ন্যাটোর ভাষায় এর সাংকেতিক নাম ‘ফ্ল্যাঙ্কার-এম’ বা ‘সুপার ফ্ল্যাঙ্কার’। প্রায় ১ হাজার ৬০০ কিলোমিটার কমব্যাট রেডিয়াসসম্পন্ন এ যুদ্ধবিমান দূরপাল্লার আক্রমণ, আকাশযুদ্ধ এবং বহুমুখী সামরিক অভিযানে সক্ষম। এছাড়া স্বল্প দৈর্ঘ্যের বা অস্থায়ী রানওয়ে থেকেও পরিচালনার সক্ষমতা থাকায় যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এটি তুলনামূলকভাবে বেশি কার্যকর বলে বিবেচিত হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এফ-৩৫ বা চীনের জে-১৬-এর মতো সর্বাধুনিক প্ল্যাটফর্ম না হলেও সুখোই-৩৫ এখনও বিশ্বের অন্যতম যুদ্ধ-পরীক্ষিত ফাইটার জেট। নতুন প্রজন্মের আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র সংযোজনের মাধ্যমে বিমানটির সক্ষমতা আরও বাড়ানো হচ্ছে।
রাশিয়া সাধারণত বছরে গড়ে প্রায় ১৪টি সুখোই-৩৫ উৎপাদন করে। তবে বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ২০২৫ সালের মে মাসে ইউনাইটেড এয়ারক্রাফট কর্পোরেশনের (ইউএসি) মহাপরিচালক ভাদিম বাদেখা উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেছিলেন।
তবে সামরিক বিশ্লেষকদের ধারণা, ইরানের অর্ডারকে অগ্রাধিকার দেয়ায় আগামী দুই থেকে তিন বছর রাশিয়ার নিজস্ব বিমানবাহিনীতে নতুন সুখোই-৩৫ সরবরাহের গতি কিছুটা কমে যেতে পারে।
ফাঁস হওয়া রুশ সরকারি নথি অনুযায়ী, ইরান মোট ৪৮টি সুখোই-৩৫ যুদ্ধবিমান কেনার পরিকল্পনা করেছে। ২০২৩ সালে দুই দেশের মধ্যে হওয়া বৃহৎ প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় এসব বিমান ছাড়াও মিল এমআই-২৮ আক্রমণ হেলিকপ্টার এবং ইয়াকোভলেভ ইয়াক-১৩০ প্রশিক্ষণ বিমান কেনার চুক্তি হয়। ১৯৯০-এর দশকের পর এটিই ইরানের প্রথম বড় যুদ্ধবিমান ক্রয় কর্মসূচি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন যুদ্ধবিমান পরিচালনার জন্য ইরান ইতোমধ্যে পাইলটদের বিশেষ প্রশিক্ষণ শুরু করেছে। ২০২৩ সালে রাশিয়া থেকে ইয়াক-১৩০ প্রশিক্ষণ বিমান পাওয়ার পর থেকেই সুখোই-৩৫ পরিচালনার প্রস্তুতি চলছে।

মিলিটারি ওয়াচ ম্যাগাজিনের দাবি, চলতি ২০২৬ সালেই ইরানের কাছে সুখোই-৩৫ সরবরাহ শুরু হতে পারে। তবে হামাদান বিমানঘাঁটির অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির কারণে মোতায়েনের সময়সূচিতে কিছুটা বিলম্ব হতে পারে। বর্তমানে রুশ ও ইরানি প্রকৌশলীরা ঘাঁটির সংস্কারকাজে নিয়োজিত রয়েছেন।
এদিকে রাশিয়ার কাছ থেকে ইরানের সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ সুখোই-৩৫-এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। রুশ সামরিক সূত্রের দাবি, তেহরান আরও ১২টি সুখোই-৩০এসএম২ যুদ্ধবিমানের অর্ডার দিয়েছে। সেগুলোর সরবরাহ ২০২৭ সালের মাঝামাঝি শুরু হতে পারে।
এছাড়া ভবিষ্যতে রাশিয়ার পঞ্চম প্রজন্মের স্টিলথ যুদ্ধবিমান সুখোই সু-৫৭ কেনার বিষয়েও ইরানের আগ্রহ রয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে উৎপাদন সীমাবদ্ধতার কারণে ২০৩০ সালের আগে এ ধরনের বিমান সরবরাহের সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুখোই-৩৫ যুক্ত হলে ইরানের বিমানবাহিনীর সক্ষমতায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে। বর্তমানে দেশটি ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের আগে কেনা গ্রুম্যান এফ-১৪ টমক্যাট, এফ-৪ ফ্যান্টম-২ এবং এফ-৫ টাইগার-২সহ পুরোনো মার্কিন যুদ্ধবিমানের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। নতুন সুখোই-৩৫ বহর সে নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের আকাশযুদ্ধ সক্ষমতাকে নতুন মাত্রা দিতে পারে।
সবার দেশ/কেএম




























