দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের মাথাব্যথা আরও বাড়ালো নেপাল
ভারতের প্রতিবেশী নেপালে ভয়াবহ রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক কূটনীতিতে নতুন করে চাপে ফেলছে নয়াদিল্লিকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা জারির পর শুরু হওয়া গণবিক্ষোভে ইতোমধ্যে অর্ধশতাধিক মানুষ নিহত হয়েছে। সহিংসতা ও জনরোষের মুখে প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলি পদত্যাগ করেছেন, দেশজুড়ে কারফিউ জারি রয়েছে এবং সেনাবাহিনী পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে।
বিক্ষোভকারীরা পার্লামেন্ট ভবন ও একাধিক নেতার বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়, যা শ্রীলঙ্কার ২০২২ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং গত বছরের বাংলাদেশ আন্দোলনের স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে। নেপালের রাজনৈতিক অস্থিরতা ভারতের জন্য উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে, কারণ অলি দিল্লি সফর শেষে মাত্র এক সপ্তাহের মাথায় পদত্যাগ করলেন।
সীমান্ত ও কৌশলগত সংযোগ
ভারতের উত্তরাখণ্ড, উত্তরপ্রদেশ, বিহার, সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গ মিলে নেপালের সঙ্গে রয়েছে ১,৭৫০ কিলোমিটার সীমান্ত। এ সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ যাতায়াত করে, আর দুই দেশের জনগণ ভিসা ছাড়াই একে অপরের দেশে কাজ ও বসবাস করতে পারে। প্রায় ৩৫ লাখ নেপালি ভারতে থাকেন, কাজ করেন এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীতে ৩২ হাজার গুর্খা সৈন্য চাকরি করছেন।
অর্থনৈতিকভাবে কাঠমান্ডু ভারতীয় আমদানির ওপর নির্ভরশীল—বিশেষত তেল ও খাদ্যের জন্য। দুই দেশের বার্ষিক বাণিজ্য ৮.৫ বিলিয়ন ডলার। সীমান্ত ঘনিষ্ঠতার কারণে নেপালে অস্থিরতা সরাসরি ভারতের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তায় প্রভাব ফেলতে পারে।
দিল্লির অস্বস্তি
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেপালের সহিংসতায় শোক প্রকাশ করেছেন এবং শান্তি ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি মন্ত্রিসভার সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারতের জন্য পরিস্থিতি ‘অস্বস্তিকর’, কারণ নেপালের তিন প্রধান রাজনৈতিক দল—অলির সিপিএন-ইউএমএল, দেউবার নেপালি কংগ্রেস এবং পুষ্প কমল দহলের মাওবাদী কেন্দ্র—তিনটির সঙ্গেই দিল্লির সম্পর্ক রয়েছে, অথচ তিন দলের বিরুদ্ধেই বিক্ষোভকারীদের ক্ষোভ প্রবল।
চীন ফ্যাক্টর
নেপালের ভূকৌশলগত অবস্থান ভারত-চীন প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দু। চীনের ওয়েস্টার্ন থিয়েটার কমান্ড নেপালের সীমান্তের ওপারেই অবস্থিত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কাঠমান্ডু বেইজিংয়ের কাছ থেকে অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতি পেয়েছে, আর ভারত-নেপাল সম্পর্ক নানা সময়ে টানাপোড়েনে পড়েছে। ২০১৯ সালে ভারতের নতুন মানচিত্রে নেপালের দাবি করা এলাকা অন্তর্ভুক্ত করা হলে দুই দেশের সম্পর্ক উত্তপ্ত হয়।
আঞ্চলিক প্রভাব
দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) কার্যত অচল। পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক খারাপ, মিয়ানমার গৃহযুদ্ধে নিমজ্জিত, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে দিল্লির সম্পর্ক শীতল। এখন নেপালের সঙ্কট নতুন করে ভারতের কূটনীতিকে চ্যালেঞ্জে ফেলছে।
অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল অশোক মেহতা বলেন,
ভারত সুপার পাওয়ার হতে চাইছে, কিন্তু সুপার পাওয়ার হওয়ার জন্য নিরাপদ ও স্থিতিশীল প্রতিবেশী প্রয়োজন। নেপালের অস্থিরতা ভারতের জন্য বড় হুমকি।
সূত্র: বিবিসি
সবার দেশে/কেএম




























