ইতিহাসের প্রাচীনতম শিল্পের সন্ধান
ইন্দোনেশিয়ায় মিললো ৬৮ হাজার বছরের গুহাচিত্র
ইন্দোনেশিয়ায় আবিষ্কৃত হলো মানব ইতিহাসের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে প্রাচীন গুহাচিত্র। দেশটির মুনা দ্বীপের একটি চুনাপাথরের গুহা থেকে উদ্ধার হওয়া এ শিল্পকর্মের বয়স প্রায় ৬৮ হাজার বছর বলে জানিয়েছেন গবেষকরা। নতুন এ আবিষ্কার মানব সভ্যতার শিল্পচর্চার সময়রেখাকে আরও পেছনে ঠেলে দিলো।
আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী নেচার-এর ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারির সংখ্যায় প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, এ গুহাচিত্র আগের যে কোনও আবিষ্কৃত গুহাচিত্রের চেয়ে অন্তত ১৫ হাজার বছর বেশি পুরোনো। এর আগে ২০২৪ সালে ইন্দোনেশিয়ার সুলাওয়েসি অঞ্চলে পাওয়া গুহাচিত্রকে সবচেয়ে প্রাচীন শিল্পকর্ম হিসেবে ধরা হতো।
গবেষকরা বলছেন, ইন্দোনেশিয়া, পূর্ব তিমুর ও অস্ট্রেলিয়া অঞ্চল প্রাচীন মানব অভিবাসন ও বসতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। মুনা দ্বীপের এ গুহাচিত্র সে ধারণাকেই আরও জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠা করছে। এতে বোঝা যায়, সুলাওয়েসি ও আশপাশের অঞ্চলে প্রাগৈতিহাসিক মানুষের উপস্থিতি এবং সাংস্কৃতিক বিকাশ অনেক আগেই শুরু হয়েছিলো।
ইন্দোনেশিয়ার ন্যাশনাল রিসার্চ অ্যান্ড ইনোভেশন এজেন্সির প্রত্নতত্ত্ববিদ আদি আগুস অক্টাভিয়ানা বলেন, আমাদের পূর্বপুরুষরা শুধু দক্ষ নাবিক ছিলেন না, তারা ছিলেন সৃজনশীল শিল্পীও। গুহার দেয়ালে হাত রেখে রঙিন রঞ্জক পদার্থ ব্যবহার করে এসব চিত্র আঁকা হয়েছে। কিছু চিত্রে আঙুলগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে ধারালো নখের মতো করে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা এ অঞ্চলের একটি স্বতন্ত্র শিল্পরীতির ইঙ্গিত দেয়।
কানাডার প্রত্নতত্ত্ববিদ অ্যাডাম ব্রাম মনে করেন, এসব হাতের চিত্রকে ইচ্ছাকৃতভাবে প্রাণীর থাবার মতো রূপ দেয়া হয়েছে। তার মতে, এর পেছনে গভীর প্রতীকী ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য থাকতে পারে, যা সে সময়ের মানুষের বিশ্বাস ও চিন্তাধারার পরিচয় বহন করে।
চিত্রগুলোর বয়স নির্ধারণে গবেষকরা ব্যবহার করেছেন আধুনিক লেজার প্রযুক্তি। গুহার দেয়ালে জমে থাকা ‘কেভ পপকর্ন’ নামে পরিচিত ক্যালসাইট স্তর থেকে নমুনা সংগ্রহ করে ইউরেনিয়াম ও থোরিয়ামের ক্ষয়ের হার বিশ্লেষণ করা হয়। এ পদ্ধতিতে চিত্রগুলোর ন্যূনতম বয়স নির্ধারণ করা সম্ভব হয়েছে।
গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, মুনা দ্বীপের এ গুহাটি একবার নয়, দীর্ঘ সময় ধরে বারবার শিল্পচর্চার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। কিছু চিত্রের ওপর প্রায় ৩৫ হাজার বছর পর নতুন ছবি আঁকার চিহ্ন পাওয়া গেছে, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এ গুহায় শিল্পচর্চার ধারাবাহিকতার প্রমাণ দেয়।
প্রত্নতত্ত্ববিদদের মতে, এ আবিষ্কার শুধু একটি শিল্পকর্ম নয়, বরং প্রাচীন মানুষের চিন্তা, বিশ্বাস ও সৃজনশীলতার এক অনন্য দলিল। মানব সভ্যতার ইতিহাসে শিল্পের সূচনা যে এত প্রাচীন—এ গুহাচিত্র সে উপলব্ধিকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করল।
সবার দেশ/কেএম




























