Sobar Desh | সবার দেশ সবার দেশ প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১২:৪০, ৬ আগস্ট ২০২৬

কারাগারে শতাধিক নেতা, বাইরে পরিবারের প্রায় সবাই

পতনের আগেই স্বজনদের নিরাপদে সরিয়ে নেন হাসিনা

পতনের আগেই স্বজনদের নিরাপদে সরিয়ে নেন হাসিনা
ছবি: সংগৃহীত

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হয়ে ওঠে—শেখ হাসিনার পরিবারের সদস্য ও নিকটাত্মীয়দের দ্রুত দেশত্যাগ, আর একই সময়ে দলের অসংখ্য নেতা-কর্মীর গ্রেফতার। সরকারের পতনের প্রায় দুই বছর পরও এই বিষয়টি আওয়ামী লীগের ভেতরে-বাইরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে রয়েছে।

দলীয় সূত্র, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং বিভিন্ন পর্যায়ের তথ্য বলছে, শেখ পরিবারের অধিকাংশ সদস্য পতনের আগেই কিংবা পতনের পরপরই নিরাপদে দেশ ছাড়তে সক্ষম হন। বিপরীতে আওয়ামী লীগের বহু কেন্দ্রীয় নেতা, সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ নেতারা গ্রেফতার হয়ে কারাগারে যান। এ বৈপরীত্য নিয়েই দলের তৃণমূলের একাংশে ক্ষোভের কথাও সামনে এসেছে।

পতনের দুই দিন আগে সে ফোনালাপ

সরকার পতনের পর সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে শেখ হাসিনা ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসের একটি ফোনালাপ।

৩ আগস্ট ২০২৪ সকাল ৮টা ১৬ মিনিটে করা ওই ফোনকলে তাপস শেখ হাসিনাকে জানান, তিনি সিঙ্গাপুর যেতে চান, কিন্তু বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ তাকে আটকে দিয়েছে। তিনি শেখ হাসিনার কাছে জানতে চান, বিদেশ যেতে পারবেন কি না।

জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ‘হ্যাঁ, যাও। যাবা না কেনো?’

এ ফোনালাপ প্রকাশের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। কারণ, ঠিক সে সময়েই সারা দেশে ছাত্র-জনতার আন্দোলন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিলো এবং সরকারের অবস্থান দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ছিলো।

৩ আগস্ট: আন্দোলনের মোড় ঘোরানো দিন

২০২৪ সালের ৩ আগস্টকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিন হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

সেদিন রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে লাখো মানুষের সমাবেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম সরকার পতনের এক দফা দাবি ঘোষণা করেন। এর মধ্য দিয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলন পূর্ণাঙ্গ সরকারবিরোধী গণ-আন্দোলনে রূপ নেয়।

একই দিনে সেনা সদরেও সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ নিয়ে আপত্তির কথা উঠে আসে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ওই সময় থেকেই সরকারের পতনের সম্ভাবনা স্পষ্ট হতে শুরু করে।

পরিবারের সদস্যরা প্রায় সবাই দেশের বাইরে

সরকার পতনের আগে ও পরে শেখ হাসিনার পরিবারের অধিকাংশ সদস্য এবং ঘনিষ্ঠ আত্মীয় দেশ ছাড়েন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়।

৫ আগস্ট দেশ ছাড়ার সময় শেখ হাসিনার সঙ্গে ছিলেন তার ছোট বোন শেখ রেহানা। পরে তিনি ভারত থেকে যুক্তরাজ্যে যান বলে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় আগেই যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছিলেন। সরকার পতনের সময় তিনি বাংলাদেশে ছিলেন না।

মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ (পুতুল) তখন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক হিসেবে নয়াদিল্লিতে দায়িত্ব পালন করছিলেন। পরবর্তীতে তিনি কখনও ভারত, কখনও সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থান করেছেন বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে।

শেখ রেহানার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক (ববি) সরকার পতনের সময় থাইল্যান্ডে ছিলেন বলে জানা যায়। টিউলিপ সিদ্দিক ও আজমিনা সিদ্দিক রূপন্তী যুক্তরাজ্যেই অবস্থান করছিলেন।

আত্মীয়দের বড় অংশের গন্তব্য ভারত

দলীয় ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনার আত্মীয়দের একটি বড় অংশ বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন।

তাদের মধ্যে রয়েছেন—

  • শেখ ফজলুল করিম সেলিম
  • শেখ ফজলে নাঈম
  • শেখ ফজলে শামস পরশ
  • আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ
  • আশিক আবদুল্লাহ
  • শেখ হেলাল উদ্দীন
  • শেখ সালাহউদ্দিন জুয়েল
  • শেখ তন্ময়
  • নূর-ই-আলম চৌধুরী (লিটন)
  • নিক্সন চৌধুরীসহ আরও কয়েকজন প্রভাবশালী আত্মীয়।

বিভিন্ন সূত্রের দাবি, তাদের অনেকেই কলকাতা ও ভারতের অন্যান্য শহরের অভিজাত আবাসিক এলাকায় অবস্থান করছেন।

দেশ ছাড়ার পথ নিয়ে নানা আলোচনা

আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্রের দাবি, সরকার পতনের আগে ও পরে শেখ পরিবারের কয়েকজন সদস্য সীমান্তপথে ভারত যান। সাতক্ষীরা, সিলেট ও ময়মনসিংহ সীমান্ত ব্যবহার করা হয়েছে বলেও বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।

একজন ছাড়া প্রায় সবাই গ্রেফতার এড়ান

শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের মধ্যে কেবল আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর ছেলে মঈন উদ্দিন আবদুল্লাহ গ্রেফতার হন। তিনি রাজনৈতিকভাবে খুব বেশি সক্রিয় ছিলেন না এবং আত্মগোপনও করেননি বলে তার ঘনিষ্ঠদের দাবি।

অন্যদিকে কারাগারে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব

সরকার পতনের পর আওয়ামী লীগের বিপুলসংখ্যক কেন্দ্রীয় নেতা, সাবেক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী এবং সংসদ সদস্য গ্রেফতার হন।

তথ্য অনুযায়ী—

  • প্রায় তিন ডজন সাবেক মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী,
  • ৫০ জনের বেশি সাবেক সংসদ সদস্য,
  • এবং অসংখ্য কেন্দ্রীয় নেতা বর্তমানে বিভিন্ন মামলায় গ্রেফতার হয়েছেন।

বর্তমানে কারাগারে থাকা উল্লেখযোগ্য নেতাদের মধ্যে রয়েছেন কাজী জাফর উল্যাহ, মো. আব্দুর রাজ্জাক, মুহাম্মদ ফারুক খান, শাজাহান খান, কামরুল ইসলাম, দীপু মনি, আহমদ হোসেন, আবদুস সোবহান গোলাপ, সালমান এফ রহমান, আনিসুল হক এবং জুনাইদ আহমেদ পলক।

এদিকে সরকারের পতনের পর সাবেক পানিসম্পদমন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেন, সাবেক শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন এবং আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মতিয়া চৌধুরী এবং তোফায়েল আহমেদ মৃত্যুবরণ করেন।

তৃণমূলে ক্ষোভ

আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দলের সাধারণ নেতা-কর্মীদের একটি অংশের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে যে, শেখ পরিবারের সদস্যরা নিরাপদে দেশ ছাড়তে পারলেও মাঠপর্যায়ের অনেক নেতা-কর্মী গ্রেফতার, মামলা ও আইনি জটিলতার মুখে পড়েছেন।

তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন দলকে সক্রিয়ভাবে সমর্থন করেও সংকটের সময় তারা প্রয়োজনীয় সহায়তা পাননি।

গবেষকের মূল্যায়ন

রাজনীতিবিষয়ক লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে ক্ষমতা ক্রমেই পারিবারিক ও আত্মীয়কেন্দ্রিক হয়ে উঠেছিলো। তার ভাষায়, ক্ষমতার সুবিধা ভোগ করেছেন মূলত পরিবারের সদস্য, ঘনিষ্ঠ আত্মীয় এবং একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী; আর সাধারণ নেতা-কর্মীরা রাজনৈতিক সংঘাতের সবচেয়ে বড় মূল্য দিয়েছেন।

তিনি মনে করেন, ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ ও পরিবারনির্ভর রাজনৈতিক কাঠামো ভবিষ্যতের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হয়ে থাকবে।

সবার দেশ/এমকেজে

জনপ্রিয়

শীর্ষ সংবাদ:

বিতর্ককে পেছনে ফেলে ‘লক আপ ২’-এর চ্যাম্পিয়ন শ্রেয়া কালরা
পতনের আগেই স্বজনদের নিরাপদে সরিয়ে নেন হাসিনা
জুলাই স্মৃতি জাদুঘর উন্মুক্ত; অনলাইনে টিকিট কাটবেন যেভাবে
বাবরের নেতৃত্বে দাপুটে জয় পাকিস্তানের, সিরিজ শেষ সমতায়
পথ হারালে জুলাই জাদুঘরে এসে আবার পথ খুঁজে নেবো: ড. ইউনূস
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের তথ্যচিত্রে ‘ত্রুটি’ নিয়ে দুঃখ প্রকাশ
জকসুর স্বাস্থ্য সম্পাদকের ওপর ছাত্রদলের হামলা
হাসিনার বক্তব্য ১০ মিনিটও শুনলেন না ৪৪ হাজার দর্শক
সাবেক এমপি আখতারুজ্জামান গ্রেফতার
গণভোটের রায় বাস্তবায়নে প্রয়োজনে জীবন দেবোব: জামায়াত আমির
খুনি হাসিনাকে বক্তব্যের সুযোগ দেয়া বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের অবমাননা
সাকিবের মাগুরার বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর
গণঅভ্যুত্থানের কৃতিত্ব জনগণকেই ফিরিয়ে দিতে হবে: নাহিদ
আবু সাঈদের ছবি ছাড়া কোনও প্রামাণ্যচিত্র নয়: ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি
জুলাই ডকুমেন্টারিতে বিকৃতি, ক্ষমা চেয়ে সংশোধনের ঘোষণা মন্ত্রীর
বাংলাদেশ দূতাবাস ফ্রান্সের উদ্যোগে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস পালিত
জুলাইযোদ্ধাকে মারধর করে বের করে দিলো বিএনপি