সত্য লিখে বাঁচা সহজ নয়: মৃত্যুর আগে বিভুরঞ্জন
মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার মেঘনা নদী থেকে উদ্ধার হলো সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট বিভুরঞ্জন সরকারের মরদেহ। শুক্রবার (২২ আগষ্ট) বিকেলে পুলিশ জানায়, বৃহস্পতিবার সকাল থেকে নিখোঁজ থাকা এ অভিজ্ঞ সাংবাদিকের লাশ ভেসে ওঠে নদীতে।
এর একদিন আগে, বৃহস্পতিবার সকাল সোয়া ৯টায় তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে একটি লেখা মেইল করেছিলেন, যার শিরোনাম ছিলো ‘খোলা চিঠি’। চিঠির ফুটনোটে তিনি লিখেছিলেন—
জীবনের শেষ লেখা হিসেবে এটা ছাপতে পারেন।
এ চিঠিতেই তিনি তার জীবনের দীর্ঘ সাংবাদিকতা অভিজ্ঞতা, সংগ্রাম, আর্থিক সংকট ও মানসিক যন্ত্রণার কথা তুলে ধরেন।
বিভুরঞ্জন সরকার লিখেছেন, আমি বিভুরঞ্জন সরকার, সাংবাদিকতার সঙ্গে আমার সম্পর্ক পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ের। দেশের রাজনৈতিক উত্থান-পতন, আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান সব দেখেছি, লিখেছি সত্যের পক্ষে। কিন্তু আজ বুঝছি— সত্য লিখে বাঁচা সহজ নয়।
তিনি জানান, পেশার শুরু স্কুল জীবন থেকেই। দৈনিক আজাদে মফস্বল সংবাদদাতা হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন। পরে দৈনিক সংবাদ, রূপালী, সাপ্তাহিক একতা, চলতিপত্র, মৃদুভাষণসহ বহু পত্রিকায় কাজ করেছেন। একসময় জনকণ্ঠের প্রথম পাতায় নিয়মিত তার লেখা ছাপা হতো। সাপ্তাহিক ‘যায়যায়দিন’-এর জনপ্রিয় কলামিস্ট তারিখ ইব্রাহিম নামটিও ছিল তার ছদ্মনাম। এরশাদের আমলে সেন্সরশিপ এড়াতে তিনি এ নাম ব্যবহার করতেন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নিয়ে কাজ করেছেন, তবে কোনও সুবিধা নেননি বলে দাবি করেছেন তিনি। অথচ তার অভিযোগ— যাদের মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা ছিলো না, তারাই সার্টিফিকেট নিয়ে সুবিধা ভোগ করেছেন।
খোলা চিঠিতে বিভুরঞ্জন লিখেছেন,
আজকের সাংবাদিকতার চ্যালেঞ্জ অন্যরকম। অনেকে সুবিধার জন্য সত্য আড়াল করে লেখেন। আমি নাম আড়াল করলেও সত্য গোপন করিনি। এজন্যই হয়তো সম্মানজনক বেতন-ভাতা পাইনি।
তিনি জানান, মাসিক ওষুধের খরচ ২০-২২ হাজার টাকা। তার মধ্যে তিনি ভুগছিলেন আর্থ্রাইটিস, লিভার সিরোসিস, হৃদরোগ, ডায়াবেটিসসহ নানা জটিল রোগে। ছেলেও অসুস্থ, তার চিকিৎসার খরচও বহন করতে হচ্ছিলো।
তিনি আক্ষেপ করে লিখেছেন, শেখ হাসিনার শাসনামলে অনেক সাংবাদিক প্লটসহ নানা সুবিধা পেয়েছেন, কিন্তু তিনি দুইবার আবেদন করেও কিছু পাননি। শেখ হাসিনাকে নিয়ে বই লিখেও কোনো রয়্যালটি পাননি বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। এমনকি, একবার প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হয়ে সিঙ্গাপুরে গেলেও তা দিয়ে কেবল কোট-টাই-জুতার খরচ মিটেছে।
তার ভাষায়, আমাকে সবাই আওয়ামী ট্যাগ দেয়। অথচ আওয়ামী আমলেও কোনো পুরস্কার পাইনি। বরং দীর্ঘ সময় চাকরিহীন ছিলাম, ঋণের বোঝা বেড়েছে। তিনি জানান, ‘আজকের পত্রিকা’য় চার বছর ধরে চাকরি করলেও বেতন বাড়েনি, পদোন্নতিও হয়নি।
তিনি হতাশা প্রকাশ করে লিখেছেন,
এক সময় কত বড় বড় মানুষ আমার লেখার প্রশংসা করতেন— অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ, শওকত ওসমান, রংগলাল সেন, অলি আহাদ থেকে শুরু করে ড. মুহাম্মদ ইউনূস পর্যন্ত। অথচ এখন আমার লেখা নাকি পাঠক টানে না।
গণমাধ্যমের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়েও তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তার অভিযোগ— সরকার পরিবর্তনের পর মিডিয়া আরও চাপে পড়েছে, নির্বাহী কর্মকর্তারা সবসময় আতঙ্কে থাকেন। মন খুলে সমালোচনা করার কথা প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন। কিন্তু প্রেস বিভাগ তো মনখোলা নয়।
খোলা চিঠির শেষে তিনি লিখেছেন,
আমার জীবনে কোনও সাফল্যের গল্প নেই। সাংবাদিক হিসেবেও শক্ত ডাল ধরতে পারিনি। দুঃখই হোক আমার জীবনের শেষ সঙ্গী। আর পৃথিবীর সকল প্রাণী সুখী হোক।
২১ আগস্ট ভোর ৫টা, সিদ্ধেশ্বরী, ঢাকা— এই সময়-স্থান উল্লেখ করে তিনি লেখা শেষ করেন। আর পরদিন মেঘনায় ভেসে ওঠে তার প্রাণহীন দেহ।
এই করুণ পরিসমাপ্তি আবারও প্রশ্ন তুলেছে— সত্য লিখে বাঁচা কি সত্যিই এত কঠিন?
সবার দেশ/কেএম




























