নতুন যাত্রায় কঠিন বার্তা
তারেক রহমানের নিকট সম্পাদকদের যে প্রত্যাশা
বিএনপি চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম কর্মসূচিতেই গণমাধ্যমের শীর্ষ প্রতিনিধিদের মুখোমুখি হলেন তারেক রহমান। শনিবার (১০ জানুয়ারি) রাজধানীর বনানীর হোটেল শেরাটনের গ্র্যান্ড বলরুমে আয়োজিত শুভেচ্ছা বিনিময় ও মতবিনিময় সভায় দেশের জাতীয় দৈনিক, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন গণমাধ্যমের সম্পাদক, প্রধান নির্বাহী ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা সরাসরি নিজেদের অভিজ্ঞতা, ক্ষোভ, প্রত্যাশা ও পরামর্শ তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে বক্তব্যের শুরুতেই তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান যায়যায়দিনের সম্পাদক শফিক রেহমান। তিনি বলেন, সামনে দিনগুলো অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং হবে এবং কিছু ক্ষেত্রে বিএনপিকে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা খতিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বিগত সময়ে বিদেশি স্বার্থ জড়িত রেখে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে নিয়োগ দেয়া হয়েছিলো, যার ফল হিসেবে রিজার্ভ লুটের মতো ঘটনা ঘটেছে। এ বিষয়ে একটি বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন তিনি। একই সঙ্গে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে অর্থ পাচার বন্ধ, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, পুলিশ বাহিনীকে নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধে পুনর্গঠন এবং সাংবাদিকদের পরিবারের জন্য পেনশন ব্যবস্থার দাবিও তোলেন শফিক রেহমান। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক এক জরিপে ৭০ শতাংশ মানুষ বিএনপিকে ভোট দিতে আগ্রহী—এ সমর্থনকে বাস্তব ভোটে রূপান্তর করাই বড় চ্যালেঞ্জ।

আমার দেশ-এর সম্পাদক মাহমুদুর রহমান বলেন, গত ১৬–১৭ বছরে ভয়, চাপ ও সুবিধাবাদের কারণে মূলধারার একটি বড় অংশ নিপীড়িত সাংবাদিকদের পাশে দাঁড়ায়নি। তিনি সাংবাদিক রুহুল আমিন গাজীর ক্যানসারে আক্রান্ত অবস্থায় কারাবন্দি থাকা এবং চিকিৎসাবিহীন মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়ার ঘটনার কথা তুলে ধরেন। একইভাবে প্রবীণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদের ওপর নির্যাতনের সময় গণমাধ্যমের নীরবতাকেও তিনি কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেন।
মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, ৫ আগস্টের পর গণমাধ্যম তুলনামূলকভাবে স্বাধীন হলেও মব ভায়োলেন্সের কারণে সাংবাদিকরা এখনও ভয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যে কাজ করছেন। সংবাদপত্র ও মিডিয়া অফিসে আগুন দেয়ার ঘটনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতিতে সাহসী সাংবাদিকতা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। তারেক রহমানের প্রতি প্রত্যাশা জানিয়ে তিনি বলেন, ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণে তিনি রাজনীতিতে ফিরেছেন। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দলীয় গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সম্মিলিতভাবে কাজ না করলে অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে।

দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম গণতন্ত্র, স্বাধীন সাংবাদিকতা ও সুশাসনের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ নিয়ে ভাবার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ জলবায়ু পরিবর্তন, অথচ রাজনৈতিক আলোচনায় এটি গুরুত্ব পাচ্ছে না। উপকূলীয় অঞ্চলে এর প্রভাব ইতোমধ্যে দৃশ্যমান উল্লেখ করে তিনি নদী দূষণ ও ভূগর্ভস্থ পানির সংকটকেও বড় সমস্যা হিসেবে তুলে ধরেন।
কালের কণ্ঠের সম্পাদক কবি হাসান হাফিজ বলেন, দীর্ঘ দেড় দশক ধরে সাংবাদিকবান্ধব প্রশাসনের অভাব ছিলো। এ সময়ে মিডিয়া ট্রায়াল, তেলবাজ সাংবাদিকতা ও রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব সাংবাদিকতার মান ও মর্যাদাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। জিয়া পরিবারকে নিয়ে বিদ্বেষমূলক প্রচার এবং রাষ্ট্রযন্ত্রকে প্রভাবিত করতে গণমাধ্যমের একটি অংশের ভূমিকা সমালোচনা করে তিনি বলেন, নতুন বাংলাদেশ গড়ার এ সুযোগ সঠিকভাবে কাজে লাগাতে না পারলে ইতিহাসে ব্যর্থ হিসেবেই স্মরণীয় হতে হবে।

মতবিনিময় সভায় আরও বক্তব্য দেন দৈনিক ইনকিলাবের এএমএম বাহাউদ্দিন, নিউ এজের সম্পাদক নূরুল কবীর, যুগান্তরের সম্পাদক আবদুল হাই শিকদার, নয়া দিগন্তের সম্পাদক সালাহ উদ্দিন বাবর এবং বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন দেশের প্রায় সব শীর্ষ গণমাধ্যমের সম্পাদক ও নির্বাহীরা। পাশাপাশি বিবিসি, আল জাজিরা, রয়টার্স ও এএফপির প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতার এবং বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তারাও অনুষ্ঠানে অংশ নেন।

বিএনপির পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য, ভাইস চেয়ারম্যান, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, মিডিয়া সেল এবং চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল এবং চেয়ারম্যানের প্রেস সচিব সালেহ শিবলী।
এ মতবিনিময় সভা তারেক রহমানের নতুন নেতৃত্বের সূচনালগ্নে গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে স্পষ্ট বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে—সমর্থনের পাশাপাশি কঠোর প্রশ্ন, আত্মসমালোচনা এবং ভবিষ্যতের জন্য উচ্চ প্রত্যাশার বার্তা।
সবার দেশ/কেএম




























