সিনিয়রিটি নাকি কর্মদক্ষতা, সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রপতির হাতে
কে হচ্ছেন দেশের ২৬তম প্রধান বিচারপতি?
বর্তমান প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের মেয়াদ শেষ হচ্ছে ২৭ ডিসেম্বর। সে সঙ্গে শূন্য হতে যাচ্ছে দেশের সর্বোচ্চ বিচারিক আসন। সংবিধানের ৯৫(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতিই নতুন প্রধান বিচারপতিকে নিয়োগ দেবেন। তবে এবার দায়িত্বটি আরও গুরুত্বপূর্ণ—কারণ নতুন প্রধান বিচারপতির মেয়াদেই অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের ফলে তিনি হতে পারেন পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টাও।
সিনিয়রিটি নাকি কর্মদক্ষতা—কোনটিকে গুরুত্ব দেয়া হবে?
প্রধান বিচারপতি নিয়োগে প্রচলিত রেওয়াজ হলো আপিল বিভাগের বিচারপতিদের মধ্য থেকে সিনিয়র সদস্যকে বেছে নেয়া। তবে বর্তমান প্রধান বিচারপতি সরাসরি হাইকোর্ট বিভাগ থেকে নিয়োগ পাওয়ায় এবার সে রেওয়াজ ভাঙার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। আপিল বিভাগে বর্তমানে প্রধান বিচারপতিসহ আছেন সাতজন বিচারপতি। তার অবসরের পর সংখ্যা দাঁড়াবে আটজন।
সম্ভাব্য তিন প্রার্থী: কে এগিয়ে?
বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম
- আপিল বিভাগের সিনিয়রতম বিচারপতি।
- জন্ম: ১৫ জুলাই ১৯৫৯।
- শিক্ষা: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এলএলবি অনার্স এবং এলএলএম করেন। ভারত থেকে এফআইসিপিএস সম্পন্ন করেন।
- বাবা: বিচারপতি একেএম নূরুল ইসলাম—সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট, এরশাদ সরকারের শিক্ষামন্ত্রী ও আইনমন্ত্রী।
- কর্মজীবন: ২০০৩ সালে হাইকোর্টের অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ। ২০২২ সালে আপিল বিভাগে উন্নীত।
- বিদেশ সফর: ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ ২০টির বেশি দেশ।
অবসর: বয়সজনিত কারণে তার অবসর ১৪ জুলাই ২০২৬। অর্থাৎ তাকে প্রধান বিচারপতি করা হলে দায়িত্ব পালনের সময় থাকবে মাত্র সাড়ে ছয় মাস।
আলোচিত রায়: তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহাল, সরকারি কর্মকর্তাদের ২টি উচ্চতর গ্রেড অনুমোদন, ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স, সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে সমাবেশ নিষিদ্ধে হাইকোর্টের রায় অনুসরণ ইত্যাদি।
বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী
- সিনিয়রিটির তালিকায় দ্বিতীয়।
- জন্ম: ১৮ মে ১৯৬১।
- শিক্ষা: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি, এলএলএম; যুক্তরাজ্য থেকে আন্তর্জাতিক আইনে এলএলএম।
- কর্মজীবন: ২০০৩ সালে অতিরিক্ত বিচারপতি, ২০০৫ সালে স্থায়ী বিচারপতি, ২০২৪ সালে আপিল বিভাগে নিয়োগ।
অবসর: ১৭ মে ২০২৮—অর্থাৎ তার দায়িত্ব পালনের সময় থাকবে তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ।
আলোচিত রায়: নারী নিকাহ রেজিস্ট্রার হওয়ার অধিকার, সরকারি কর্মকর্তাদের ১৫০ দিনের বেশি ওএসডি রাখা অবৈধ ঘোষণা, তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের রায়কে অবৈধ ঘোষণা, পেনশন সুবিধা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ রায়।
বিচারপতি মো. রেজাউল হক
- সিনিয়রিটির তৃতীয় স্থানে।
- জন্ম: ২৪ এপ্রিল ১৯৬০।
- শিক্ষা: ১৯৮৪ সালে এলএলবি-এলএলএম সম্পন্ন করে
- কর্মজীবন: ২০০৪ সালে অতিরিক্ত বিচারপতি, ২০০৬ সালে স্থায়ী বিচারপতি, ২০২৪ সালে আপিল বিভাগে উন্নীত।
অবসর: ২৩ এপ্রিল ২০২৭—জুবায়ের রহমান চৌধুরীরও আগে।
আলোচিত রায়: তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহাল, সংবিধানের ১৬তম সংশোধনী বাতিল, ধর্ষণ মামলায় ‘শুধু মেডিকেল প্রমাণ না থাকলেই অভিযুক্ত নির্দোষ নয়’—ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা, চেম্বার কোর্টে গুরুত্বপূর্ণ জামিন স্থগিতাদেশ।
কোন দিকে যাচ্ছে সিদ্ধান্ত?
সিনিয়রিটির দিক থেকে বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম এগিয়ে থাকলেও তার স্বল্প মেয়াদ অনেক ক্ষেত্রে ‘ঝুঁকি’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। অন্যদিকে বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর দীর্ঘ মেয়াদ ও বহুল আলোচিত রায় তাকে শক্তিশালী প্রার্থী করে তুলেছে। তৃতীয় অবস্থানে থাকা বিচারপতি মো. রেজাউল হকও আলোচিত রায় ও বিচারিক অভিজ্ঞতার কারণে দৌড়ে আছেন।
শেষ পর্যন্ত মহামান্য রাষ্ট্রপতি কাকে বেছে নেবেন—সেটিই এখন বিচারাঙ্গন ও রাজনৈতিক অঙ্গনের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। শিগগিরই দেশ পেতে যাচ্ছে তার ২৬তম প্রধান বিচারপতি, যিনি একই সঙ্গে হতে পারেন পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মুখ্য দায়িত্বশীল।
সবার দেশ/কেএম




























