জুলাই আন্দোলনের তরুণরাই আগামীর বিশ্বনেতৃত্ব দেবে: প্রধান উপদেষ্টা
জুলাই আন্দোলনের তরুণ বিপ্লবীরাই একদিন বিশ্বমঞ্চে নেতৃত্ব দেবেন—এমন আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেছেন, এ প্রজন্মের হাত ধরেই শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্ব ব্যবস্থারও বড় ধরনের রূপান্তর ঘটবে।
বুধবার (২৮ জানুয়ারি) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত ‘ডিজিটাল ডিভাইস অ্যান্ড ইনোভেশন এক্সপো-২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ড. ইউনূস বলেন, দেশের রাজনীতিতে যেমন জুলাই আন্দোলন একটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে, তেমনি এ ডিজিটাল ইনোভেশন এক্সপো তথ্যপ্রযুক্তি খাতে এক নতুন বিপ্লবের সূচনা করবে। তিনি স্মরণ করেন, জুলাই অভ্যুত্থানের সময় ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র জনবিক্ষোভ সৃষ্টি করেছিল, যা একটি অত্যন্ত শক্তিশালী সরকারের পতনকে ত্বরান্বিত করে।
তিনি বলেন, আজকের বাংলাদেশে ডিজিটাল খাত কেবল একটি সেক্টর নয়, বরং এটি দেশের মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে। ভবিষ্যতের বড় সব পরিবর্তন এ খাত থেকেই আসবে এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রশাসনসহ অন্যান্য সব ক্ষেত্রকে প্রভাবিত করবে। তবে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, অতীতে নাগরিক সেবার ডিজিটালাইজেশনের কথা কাগজে-কলমে বলা হলেও বাস্তবে তার কার্যকর প্রতিফলন দেখা যায়নি।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, সরকারের দায়িত্ব জনগণের ওপর কিছু চাপিয়ে দেওয়া নয়; বরং একটি কার্যকর, সহজ ও স্বচ্ছ সিস্টেম তৈরি করে তা জনগণের হাতে তুলে দেওয়া। মানুষ নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী সেই সিস্টেম ব্যবহার করবে—এটাই তথ্যপ্রযুক্তির প্রকৃত শক্তি।
পাহাড়ের তিন জেলার শিক্ষা ব্যবস্থার চিত্র তুলে ধরে ড. ইউনূস বলেন, সেখানে প্রায় আড়াই হাজার স্কুলের মধ্যে মাত্র ১২টিতে ইন্টারনেট সংযোগ রয়েছে। অথচ অনেক জায়গায় যেখানে শিক্ষক পাওয়া যায় না, সেখানে ইন্টারনেটই হতে পারে সবচেয়ে বড় শিক্ষক। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার শিক্ষার বৈষম্য কমাতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বেকারত্ব ও কর্মসংস্থান প্রসঙ্গে ড. ইউনূস প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে বলেন, সবার জন্য চাকরি নিশ্চিত করার ধারণাটিই আসলে ভুল। তাঁর ভাষায়, এটি এক ধরনের আধুনিক দাসপ্রথা। তিনি তরুণদের চাকরির পেছনে না ছুটে উদ্যোক্তা হওয়ার আহ্বান জানান এবং বলেন, এ ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা হবে সহায়ক হিসেবে পাশে দাঁড়ানো।
সরকারি প্রশাসন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, কোনো কর্মকর্তার পাঁচ বছরের বেশি একই ধরনের সরকারি চাকরি করা উচিত নয়। দীর্ঘ সময় একই পদে থাকলে মানুষের সৃজনশীলতা নষ্ট হয় এবং একটি নির্দিষ্ট মানসিকতা গড়ে ওঠে। তিনি প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে ১০ বছর পরপর নতুন করে ঢেলে সাজানোর পরামর্শ দেন।
দেশের ভাবমূর্তি রক্ষায় জালিয়াতি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করে ড. ইউনূস বলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশ জালিয়াতির জন্য বিশ্বে নেতিবাচকভাবে পরিচিত হয়ে উঠেছে, যা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করছে। প্রযুক্তিতে প্রকৃত উন্নয়ন ঘটাতে হলে এই জালিয়াতির সংস্কৃতি চিরতরে বন্ধ করতে হবে।
শেষে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশকে নিয়ে আমরা মাথা উঁচু করে চলতে চাই। সেই সক্ষমতা ও মেধা আমাদের রয়েছে। তরুণ প্রজন্মের উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগিয়ে একটি স্বচ্ছ, জালিয়াতিমুক্ত ও প্রযুক্তিনির্ভর বাংলাদেশ গড়াই বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
সবার দেশ/এফও




























