১০০ বিলিয়ন রেমিট্যান্সের লক্ষে শ্রম ব্যবস্থার সংস্কার অপরিহার্য
শ্রমবাজারের অন্ধকার দিক: দালাল চক্র, অতিরিক্ত খরচ ও অনিরাপত্তা - সংস্কারের এখনই সময়
[এই ধারাবাহিক ফিচারের পূর্ববর্তী পর্বগুলোতে ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স অর্জনের ভিশন, জিরো মাইগ্রেশন কস্ট বাস্তবায়নের জন্য রাষ্ট্রীয় রিভলভিং ফান্ডের ধারণা, দক্ষ কর্মী প্রেরণের প্রয়োজনীয়তা এবং স্বদেশ প্রত্যাগত প্রবাসীদের উদ্যোক্তা রূপান্তরের ‘Remit–Return–Rebuild’ মডেল নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়—আমাদের বৈদেশিক কর্মসংস্থান ব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা দূর না করে কি এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব?]
বাংলাদেশ আজ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ কর্মী প্রেরণকারী দেশ। লক্ষ লক্ষ কর্মী মধ্যপ্রাচ্য, পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ইউরোপ ও অন্যান্য অঞ্চলে কাজ করছেন। তাদের পাঠানো অর্থ—রেমিট্যান্স—জাতীয় অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। এ আয় দেশের বৈদেশিক মুদ্রা ভান্ডার সমৃদ্ধ করছে, গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছে এবং অসংখ্য পরিবারকে দারিদ্র্য থেকে উত্তরণের সুযোগ করে দিচ্ছে। তবে এ সাফল্যের আড়ালে রয়েছে একটি জটিল বাস্তবতা—যেখানে অনিয়ম, অস্বচ্ছতা, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং মাঝেমধ্যে প্রশাসনিক জটিলতা কর্মীদের জন্য অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি তৈরি করে।
এ অন্ধকার দিকগুলো নিয়ে আলোচনা অনেক সময় অস্বস্তিকর হতে পারে। কিন্তু এগুলো এড়িয়ে গেলে ১০০ বিলিয়ন রেমিট্যান্সের লক্ষ্য বাস্তবে অর্জন করা কঠিন হবে।
দালাল চক্র: প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার ফল বাংলাদেশে বিদেশে কর্মী পাঠানোর জন্য সরকার অনুমোদিত বহু রিক্রুটিং এজেন্সি রয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানগুলো বৈদেশিক কর্মসংস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তারা বিদেশি নিয়োগকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন, ডিমান্ড সংগ্রহ, কর্মী প্রস্তুত করা এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।
কিন্তু বাস্তবে শ্রমবাজারের নিচের স্তরে একটি অনানুষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক সক্রিয়-যা সাধারণভাবে ‘দালাল চক্র’ নামে পরিচিত। গ্রাম বা স্থানীয় পর্যায়ে কর্মী সংগ্রহের ক্ষেত্রে অনেক সময় এ মধ্যস্বত্বভোগীরা সক্রিয় ভূমিকা পালন করে।
সমস্যা হলো—এ প্রক্রিয়া সাধারণত অস্বচ্ছ। নির্ধারিত খরচের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ নেয়া, দ্রুত ভিসার প্রলোভন দেখানো বা অবাস্তব বেতনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া—এসব ঘটনা প্রায়ই শোনা যায়। ফলাফল—একজন কর্মী বিদেশে যাওয়ার আগেই একটি বড় ঋণের বোঝা নিয়ে যাত্রা শুরু করেন। এ ঋণ শুধু ব্যক্তিগত সংকট নয়; এটি জাতীয় শ্রমবাজারের মান ও সুনামের ওপরও চাপ সৃষ্টি করে।
অতিরিক্ত মাইগ্রেশন খরচ: উন্নয়ন নাকি ঋণফাঁদ?
সরকারি নির্দেশনায় মাইগ্রেশন খরচ (সরকারও অবাস্তব একটা খরচ নির্ধারণ করে থাকে) নির্ধারিত থাকলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই কর্মীরা নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি অর্থ প্রদান করেন বা এজেন্সিরা নানান কারণে বেশি নিতে বাধ্য হয়। অনেক ক্ষেত্রে কর্মীরা বিদেশে যাওয়ার জন্য জমি বিক্রি করেন, আত্নীয়স্বজন থেকে ধার নেন কিংবা উচ্চ সুদে ঋণ নেন। বিদেশে গিয়ে প্রথম বেশ কয়েক মাসের ক্ষেত্র বিশেষে বছরাধিকালের উপার্জনের প্রায় পুরোটা ঋণ পরিশোধে চলে যায়। এটি একটি উদ্বেগজনক বাস্তবতা।
এ বাস্তবতার কারণ হিসেবে বলা যায়, বিদেশে গিয়ে একজন কর্মী যদি প্রথম থেকেই আর্থিক চাপের মধ্যে পড়েন, তাহলে তার কর্মজীবনের শুরুটাই হয় অনিশ্চয়তার মধ্যে। এ বাস্তবতা ‘জিরো মাইগ্রেশন কস্ট’ নীতির প্রয়োজনীয়তাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। কিন্তু শুধুমাত্র নীতিগত ঘোষণা যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন স্বচ্ছ তদারকি, ডিজিটাল ট্র্যাকিং এবং কঠোর জবাবদিহিতা।
মিথ্যা বেতন প্রতিশ্রুতি ও চুক্তির জটিলতা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো কর্মসংস্থান চুক্তির স্বচ্ছতা। অনেক ক্ষেত্রে কর্মীরা বিদেশে গিয়ে জানতে পারেন যে প্রতিশ্রুত বেতন ও বাস্তব বেতনের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। চুক্তিপত্রের ভাষা অনেক সময় জটিল এবং অনেক কর্মীর পক্ষে তা পুরোপুরি বোঝা কঠিন। ফলে অনেক ক্ষেত্রে হতাশা তৈরি হয়। কেউ কেউ চুক্তিভঙ্গ করেন বা অনিয়মিত কাজে যুক্ত হয়ে পড়েন। এতে শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতিই হয় না—বাংলাদেশি কর্মীদের সামগ্রিক ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
কর্মস্থলে অনিরাপত্তা ও বাস্তব চ্যালেঞ্জ:
বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশি কর্মীদের বেশিরভাগই কঠোর পরিশ্রমী এবং দায়িত্বশীল। অনেক নিয়োগকর্তা তাদের দক্ষতা ও নিষ্ঠার প্রশংসা করেন। তবে কিছু বিচ্ছিন্ন ক্ষেত্রে আবাসনের নিম্নমান, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা বা পর্যাপ্ত তদারকির অভাবের অভিযোগ পাওয়া যায়। যদিও এগুলো সর্বত্র নয়, তবু এ ধরনের ঘটনা আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে নেতিবাচক বার্তা দিতে পারে। এ কারণেই কর্মী সুরক্ষা এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রিক্রুটিং এজেন্সির অবদান:
বাস্তবতা স্বীকার করা প্রয়োজন বাংলাদেশে বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাতের আলোচনায় প্রায়ই একটি বিষয় উপেক্ষিত হয়-রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর ভূমিকা। বাস্তবতা হলো, আজ যে প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স বাংলাদেশে আসে, তার পেছনে যেমন প্রবাসী কর্মীদের শ্রম ও ত্যাগ রয়েছে, তেমনি বিদেশি শ্রমবাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোরও একটি উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে।
বিদেশি নিয়োগকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন, ভিসা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা, কর্মী নির্বাচন এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক ধাপ অতিক্রম করা—এসব ক্ষেত্রে এ প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে কিছু অসাধু ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কারণে পুরো খাতটি অনেক সময় নেতিবাচক ধারণার মধ্যে পড়ে যায়। ফলে ভালো ও দায়িত্বশীল এজেন্সিগুলোও অনেক সময় একই ধরনের সন্দেহের মুখে পড়ে।
এ বাস্তবতা স্বীকার করা জরুরি—শ্রমবাজারে সংস্কার মানে শুধু সমস্যা চিহ্নিত করা নয়; বরং ভালোদের উৎসাহ দেয়া এবং খারাপদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া। অর্থাৎ প্রয়োজন ‘দুষ্টের দমন ও শিষ্টের লালন’ কর।
আরও পড়ুন <<>> Remit–Return–Rebuild: প্রবাসী থেকে উদ্যোক্তা—বাংলাদেশ কি প্রস্তুত?
সংস্কারে জাপান মডেল:
একটি কাঠামোগত প্রসেস বাংলাদেশের জন্য একটি কার্যকর শিক্ষণীয় উদাহরণ হতে পারে জাপানে বৈদেশিক কর্মী নিয়োগ ব্যবস্থা। জাপানে বিদেশি কর্মী নিয়োগ মূলত একটি ত্রিস্তরীয় লাইসেন্সভিত্তিক কাঠামোর মাধ্যমে পরিচালিত হয়:
- Implementing Organization (জাপানি নিয়োগকর্তা)
- Supervising Organization (সরকার অনুমোদিত তদারকি সংস্থা)
- Sending Organization (বিদেশি দেশের অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সি)
এ কাঠামোতে নিয়োগদাতা সরাসরি এলোমেলোভাবে কর্মী নেয় না। চাহিদাপত্রে কাজের ধরন, বেতন, কর্মঘণ্টা এবং আবাসনের বিষয় স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকে।
Supervising Organization পুরো প্রক্রিয়া তদারকি করে এবং বিদেশি দূতাবাস প্রয়োজনীয় যাচাই সম্পন্ন করে। কর্মীরা সরাসরি ইন্টারভিউয়ের মাধ্যমে নির্বাচিত হন। ফলে মধ্যস্বত্বভোগীর ভূমিকা সীমিত হয় এবং অস্বচ্ছতা কমে।
কেনো জাপান মডেলে হয়রানি কম জাপানের এ ব্যবস্থায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে:
✔ লাইসেন্স ছাড়া মধ্যস্থতা সম্ভব নয়
✔ ডিমান্ড লিখিত ও নির্দিষ্ট
✔ সরকারি তদারকি বাধ্যতামূলক
✔ দূতাবাস যাচাই প্রক্রিয়া রয়েছে
✔ চুক্তি ও শর্ত পূর্বনির্ধারিত
এর ফলে শ্রম রফতানি একটি অনিয়ন্ত্রিত বাজার নয়, বরং একটি কাঠামোবদ্ধ শিল্পে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ কীভাবে এ মডেল আধুনিকায়ন করতে পারে জাপান মডেল সরাসরি অনুকরণ না করে তার মূল নীতিগুলো গ্রহণ করে একটি আধুনিক ব্যবস্থা তৈরি করা যেতে পারে।
- প্রথমত, একটি জাতীয় Skill Bangladesh Digital Migration Portal তৈরি করা যেতে পারে। যেখানে বিদেশি ডিমান্ড, দূতাবাস যাচাই, রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা, কর্মীর তথ্য এবং চুক্তিপত্র—সবকিছু ডিজিটালভাবে সংরক্ষিত থাকবে।
- দ্বিতীয়ত, একটি শক্তিশালী তদারকি কাঠামো তৈরি করা যেতে পারে যা রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করবে।
- তৃতীয়ত, নিয়োগকর্তা এবং রিক্রুটিং এজেন্সির জন্য একটি পারফরম্যান্স রেটিং সিস্টেম চালু করা যেতে পারে।
এর মাধ্যমে দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলো স্বীকৃতি পাবে এবং অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।
ব্র্যান্ড বনাম বাস্তবতা:
আমরা যদি ‘স্কিল বাংলাদেশ’ নামে একটি বৈশ্বিক ব্র্যান্ড তৈরি করতে চাই, তাহলে তার প্রথম শর্ত হলো অভ্যন্তরীণ শুদ্ধি। সংস্কার ছাড়া ব্র্যান্ড টেকে না। স্বচ্ছতা ছাড়া আস্থা জন্মায় না। আর আস্থা ছাড়া আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে নেতৃত্ব সম্ভব নয়।
উপসংহার:
বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাত একটি বিশাল সম্ভাবনার ক্ষেত্র। কিন্তু এ সম্ভাবনাকে টেকসই করতে হলে দালাল চক্র, অতিরিক্ত খরচ, মিথ্যা প্রতিশ্রুতি এবং জবাবদিহিতার ঘাটতি দূর করতে হবে। জাপান মডেল আমাদের দেখায়—কাঠামোবদ্ধ, লাইসেন্সভিত্তিক এবং তদারকিসম্পন্ন ব্যবস্থা হলে হয়রানি কমে। আমরা যদি সত্যিই ১০০ বিলিয়ন রেমিট্যান্স অর্জন করতে চাই, তাহলে প্রথমে আমাদের গড়ে তুলতে হবে—একটি সুশাসিত, স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক শ্রমব্যবস্থা।
এ বাস্তবতাগুলো স্পষ্ট করে যে বৈদেশিক কর্মসংস্থান ব্যবস্থায় কাঠামোগত সংস্কার এখন আর বিলাসিতা নয়—এটি অপরিহার্য। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা ছাড়া এ খাতকে টেকসই করা সম্ভব নয়। পরবর্তী পর্বে আলোচনা করা হবে—কিভাবে একটি আধুনিক, স্বচ্ছ ও ডিজিটাল মাইগ্রেশন ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা যায়, যেখানে ভালো প্রতিষ্ঠানগুলো উৎসাহ পাবে এবং অনিয়মের পথ ক্রমশ সংকুচিত হবে।
সংস্কার এখন আর বিকল্প নয়—এটি অপরিহার্য।
লেখক
শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান কর্মী
ড্যাফোডিল গ্রুপ সিইও।




























