জনপ্রিয়তার শীর্ষে তারেক রহমান, সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ
সদ্য প্রয়াত বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় রেকর্ডসংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণ এবং ২৫ ডিসেম্বর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে ফেরাকে ঘিরে জনতার ঢল—এ দুই ঘটনাই স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিয়েছে বিএনপির প্রতি জনগণের আস্থা ও আবেগ এখন তুঙ্গে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ বাস্তবতা একদিকে বিএনপিকে নির্বাচনী মাঠে শক্ত অবস্থানে নিয়ে গেছে, অন্যদিকে তারেক রহমানের সামনে এনে দিয়েছে একাধিক বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশ্লেষকদের ধারণা, খালেদা জিয়ার প্রয়াণের পর দলীয় নেতৃত্বের সব দায়িত্ব এখন সরাসরি তারেক রহমানের কাঁধে। একই সঙ্গে দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতাও দ্রুত নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে। ফলে শুধু দল পরিচালনা নয়, জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করাই হয়ে উঠেছে তারেক রহমানের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী বলেন, খালেদা জিয়ার তিরোধানের পর পুরো দেশ এখন তারেক রহমানের দিকে তাকিয়ে। দলকে নেতৃত্ব দেয়ার অভিজ্ঞতা তার আছে, কিন্তু এবার তাকে প্রমাণ করতে হবে তিনি কেবল দলের নেতা নন, বরং জাতির নেতৃত্ব দেয়ার যোগ্যও। তার মতে, একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকার ও নির্বাচন কমিশনের হলেও বড় রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির এবং তারেক রহমানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের পর দেশকে নতুন করে গড়ার দায়িত্বও আসবে। মানুষ আগের মতো রাষ্ট্রচালনা আর চায় না। তারা দুর্নীতিমুক্ত, মানবিক ও জবাবদিহিমূলক সমাজ প্রত্যাশা করে। সে প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারলে জনপ্রিয়তার এ ঢেউ দীর্ঘস্থায়ী হবে না।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ ১৭ বছর নির্বাসনের পর তারেক রহমানের দেশে ফেরা এবং এর অল্প সময়ের মধ্যেই খালেদা জিয়ার প্রয়াণ—এ দুটি ঘটনা বিএনপির জন্য এক ধরনের আবেগী সহানুভূতির পরিবেশ তৈরি করেছে। খালেদা জিয়ার জানাজায় দল-মত নির্বিশেষে মানুষের অংশগ্রহণ সে আবেগেরই বহিঃপ্রকাশ। অনেকের মতে, এ আবেগ নির্বাচনের মাঠে বিএনপির পক্ষে বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারে।
ডেমোক্রেসি ডায়াসের প্রধান ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন মনে করেন, তারেক রহমানের সামনে চ্যালেঞ্জ শুধু নির্বাচনের আগেই নয়, সরকার গঠন করতে পারলেও তা অব্যাহত থাকবে। তার মতে, অর্থনীতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি হবে নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। তিনি বলেন, তারেক রহমান তার সাম্প্রতিক বক্তব্যে প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহার করে সামনে তাকানোর কথা বলেছেন, যা জনগণের মধ্যে বড় প্রত্যাশা তৈরি করেছে। এখন সে প্রত্যাশা কতটা বাস্তবে রূপ নেয়, সেটাই হবে আসল প্রশ্ন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশের মানুষ আবেগপ্রবণ। আবেগ যেমন দ্রুত তৈরি হয়, তেমনি দ্রুত মিলিয়েও যায়। ফলে তারেক রহমানকে এখন কাজের মাধ্যমে বিশ্বাস ধরে রাখতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন, আসন্ন নির্বাচনে তরুণ ভোটাররা বড় ভূমিকা রাখবে। তরুণরা অতীত নয়, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সক্ষমতা দেখতে চায়।
তিনি আরও বলেন, বিএনপির নেতাকর্মীদের আচরণও বড় বিষয়। বিশৃঙ্খলা এড়িয়ে প্রশাসনের সঙ্গে সহযোগিতা এবং স্থিতিশীল পরিবেশ বজায় রাখা দলটির জন্য অত্যন্ত জরুরি।
এদিকে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, দেশের মানুষ তারেক রহমানের ওপর আস্থা রেখেছে এবং তিনি সে আস্থার প্রতিদান দিতে কাজ শুরু করেছেন। জনগণের ভোটে ক্ষমতায় গেলে মানুষ তা বাস্তবে বুঝতে পারবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তারেক রহমান নিজেও সাম্প্রতিক বক্তব্যে দায়িত্বের বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন। বৃহস্পতিবার নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি বলেন, তার মা খালেদা জিয়া আজীবন মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন এবং সে উত্তরাধিকার বহনের দায়িত্ব তিনি গভীরভাবে অনুভব করছেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, যেখানে তার মায়ের পথচলা থেমেছে, সেখান থেকেই তিনি সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবেন।
আন্তর্জাতিক পর্যায়েও তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন ও খালেদা জিয়ার মৃত্যু বাংলাদেশের নির্বাচনী সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। হংকংভিত্তিক গণমাধ্যম সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট এক বিশ্লেষণে বলেছে, এই দুটি ঘটনা বিএনপির প্রতি সহানুভূতির স্রোত আরও জোরালো করতে পারে।
বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়, ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর এটিই দেশের প্রথম নির্বাচন এবং এতে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারছে না। এ প্রেক্ষাপটে বিএনপি তুলনামূলকভাবে সুসংহত অবস্থানে রয়েছে।
ভারত ও আঞ্চলিক রাজনীতির দিক থেকেও আসন্ন নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ভারতের ও.পি. জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্ত বলেন, খালেদা জিয়ার মৃত্যুর আগেই তারেক রহমানকে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখা হচ্ছিলো। তরুণ ভোটারদের প্রধান প্রত্যাশা ভালো শাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি, যা নির্বাচনী ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে বিশ্লেষকদের মত, তারেক রহমানের সামনে সুযোগ যেমন বড়, তেমনি চ্যালেঞ্জও কঠিন। জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা এ সময়ে তাকে প্রমাণ করতে হবে—তিনি শুধু আবেগের নেতা নন, বরং কার্যকর রাষ্ট্রনায়ক হিসেবেও প্রস্তুত।
সবার দেশ/কেএম




























