তারেক রহমানের ‘আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান’ উম্মোচন
আগামীতে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেলে বিএনপি জনগণের দৈনন্দিন সমস্যা সমাধানে কার্যকর ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেবে বলে জানিয়েছেন দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেন, রাজনীতি শুধু সেমিনার ও সিম্পোজিয়ামের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। সংবিধান ও আইন সংস্কারের পাশাপাশি মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানের মতো মৌলিক বিষয়গুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
শনিবার (১০ জানুয়ারি) সকালে রাজধানীর বনানীতে হোটেল শেরাটনের গ্র্যান্ড বলরুমে জাতীয় পর্যায়ের গণমাধ্যমের সম্পাদক ও সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
মতবিনিময় সভায় তারেক রহমান ভবিষ্যতে বিএনপির রাষ্ট্র পরিচালনার পরিকল্পনার বিস্তারিত তুলে ধরেন। নারী উন্নয়ন, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, প্রবাসী কল্যাণ, পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের সংস্কারকে তিনি দলের অগ্রাধিকারভিত্তিক কর্মসূচির অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, আগামী ২২ জানুয়ারি থেকে বিএনপি তাদের সব ধরনের পরিকল্পনা নিয়ে জনগণের সামনে যাবে।
নারীর ক্ষমতায়ন ও ফ্যামিলি কার্ড
তারেক রহমান বলেন, আগামী নির্বাচনে জনগণের ম্যান্ডেট পেলে নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে বিশেষ উদ্যোগ নেয়া হবে। তিনি জানান, দেশে প্রায় চার কোটি পরিবার রয়েছে এবং প্রতিটি পরিবারের নারীদের রাষ্ট্রীয় সহায়তার আওতায় আনতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করা হবে।
তার ভাষায়, এ কার্ড হবে সর্বজনীন। এর মাধ্যমে নারীরা সরাসরি রাষ্ট্রীয় সুবিধা পাবেন। তিনি বলেন, দেশের অর্ধেক জনসংখ্যা নারী। তাদের বাদ দিয়ে কোনও উন্নয়ন সম্ভব নয়। বেগম খালেদা জিয়া নারীদের শিক্ষায় গুরুত্ব দিয়েছিলেন, আর বিএনপি আগামী দিনে নারীদের অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করতে চায়।
কৃষক কার্ড ও কৃষি খাতে সহায়তা
কৃষি খাত প্রসঙ্গে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, দেশে সরাসরি কৃষিকাজে যুক্ত জমির মালিক কৃষকের সংখ্যা প্রায় এক কোটি। অতীতে বিএনপি সরকার কৃষকদের জন্য বিভিন্ন কার্যকর উদ্যোগ নিয়েছিলো।
আগামীতে কৃষকদের জন্য ‘কৃষক কার্ড’ চালুর পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, এ কার্ডের মাধ্যমে সার, বীজ ও কৃষি উপকরণে ভর্তুকিসহ নানা সুবিধা দেয়া হবে, যাতে কৃষকরা উৎপাদনে উৎসাহ পান এবং কৃষি খাত আরও শক্তিশালী হয়।
স্বাস্থ্য খাতে সংস্কার ও জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ
স্বাস্থ্য খাত সংস্কারের বিষয়ে তারেক রহমান বলেন, প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম—এ নীতিতে বিএনপি কাজ করতে চায়। ইউরোপের দেশগুলোর আদলে বাংলাদেশে কমিউনিটি পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবাকে শক্তিশালী করা হবে।
তিনি জানান, এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে, যার ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ নারী হবেন। তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্বাস্থ্য সচেতনতা, পুষ্টি ও জীবনযাপন বিষয়ে পরামর্শ দেবেন। একই সঙ্গে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণেও তারা ভূমিকা রাখবেন। তারেক রহমান বলেন, দেশের সম্পদ সীমিত, তাই জনসংখ্যাকে যৌক্তিক পর্যায়ে রাখা জরুরি।
প্রবাসী কল্যাণ ও জনশক্তি রফতানি
প্রবাসী কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, প্রতিবছর প্রায় ৮ থেকে ১০ লাখ মানুষ বিদেশে গেলেও তাদের বড় অংশই অদক্ষ। ভাষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মী পাঠানো গেলে জনশক্তি রফতানি থেকে আয়ের পরিমাণ অনেক বাড়বে।
তিনি বলেন, ভোকেশনাল ও টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটগুলো আধুনিকায়ন করা হবে। মধ্যপ্রাচ্য, জাপান, ইউরোপ ও চীনের বাজারের চাহিদা অনুযায়ী ভাষা ও দক্ষতা প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। পাশাপাশি প্রবাসী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ বন্ড সুবিধা চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।
আইটি পার্ক ও তরুণদের কর্মসংস্থান
তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থান ও আইটি খাতের বিকাশে বিএনপির পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, দেশের আইটি পার্কগুলোকে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হবে। তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য ছোট অফিস স্পেস ও ফ্রি ওয়াইফাই সুবিধা দেয়া হবে।
তিনি বলেন, অনেক ফ্রিল্যান্সার বাসা বা মেসে বসে কাজ করেন। তাদের জন্য ব্যবসায়িক ঠিকানা ও কর্মস্পেস নিশ্চিত করা গেলে তারা আরও বড় পরিসরে কাজ করতে পারবেন। পেপ্যালসহ আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ের জটিলতা দূর করতেও কাজ শুরু হয়েছে বলে জানান তিনি।
গণতন্ত্র, জবাবদিহি ও সংস্কার
গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার ওপর জোর দিয়ে তারেক রহমান বলেন, জাতীয় পর্যায় থেকে শুরু করে স্থানীয় সরকার ও ট্রেড বডি—সব ক্ষেত্রেই নিয়মিত নির্বাচন নিশ্চিত করতে হবে। গণতন্ত্র ও জবাবদিহির চর্চা থাকলেই দেশের সমস্যার সমাধান সম্ভব।
তিনি বলেন, বিএনপি ৫ আগস্টের আগের পরিস্থিতিতে ফিরে যেতে চায় না। হিংসা ও প্রতিহিংসার রাজনীতি দেশের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে। তাই সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশ গড়ার আহ্বান জানান তিনি।
সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সংস্কার তিন ভাগে বিভক্ত—সাংবিধানিক, আইনগত এবং মানুষের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রা ও নিরাপত্তা। এতদিন সাংবিধানিক ও আইনগত সংস্কার নিয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে, কিন্তু মানুষের দৈনন্দিন জীবন, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান ও শিক্ষার মতো মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা তুলনামূলকভাবে কম হয়েছে।
তারেক রহমান বলেন, এসব বিষয় নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর আরও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও কর্মসূচি থাকা জরুরি, কারণ মানুষের প্রকৃত প্রত্যাশা এখানেই নিহিত।
সবার দেশ/কেএম




























