এ নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রার নতুন অধ্যায়ের সূচনা
হার-জিতই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য: বিদায়ী ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা
দীর্ঘ ১৭ বছর পর অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনকে ‘উৎসবমুখর, অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ’ উল্লেখ করে জাতির উদ্দেশে দেয়া বিদায়ী ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, হার-জিতই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। তিনি বিজয়ী ও পরাজিত—উভয় পক্ষকেই অভিনন্দন জানান এবং বলেন, যারা জয়ী হয়েছেন তারা মোট ভোটের প্রায় অর্ধেক পেয়েছেন, আবার যারা জয়ী হতে পারেননি তারাও প্রায় অর্ধেক ভোট পেয়েছেন। এতে প্রমাণ হয় জনগণ বিভক্ত নয়, বরং সক্রিয়ভাবে মত প্রকাশ করেছে।
সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) রাতে জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে তিনি বলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের দায়িত্বের সমাপ্তি ঘটছে। দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রাক্কালে তিনি দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
ভাষণের শুরুতেই তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষকে অভিনন্দন জানাচ্ছেন দীর্ঘ দেড় যুগ পর একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও শান্তিপূর্ণ জাতীয় নির্বাচন সফলভাবে সম্পন্ন করার জন্য। ভোটার, রাজনৈতিক দল, প্রার্থী, নির্বাচন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি প্রশংসনীয় নজির স্থাপিত হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ভবিষ্যতে বাংলাদেশে নির্বাচন কেমন হওয়া উচিত—এ ভোট সে মানদণ্ড স্থাপন করেছে বলেও উল্লেখ করেন।
বিদায়ের প্রাক্কালে তিনি ফিরে যান ৫ আগস্টের স্মৃতিতে। তার ভাষায়, সেটি ছিলো ‘মহা মুক্তির দিন’। তিনি বলেন, ছাত্র-তরুণদের অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশ একটি দুঃসময় থেকে বেরিয়ে আসে। তবে সে সময় রাষ্ট্রযন্ত্র ছিলো অচল। বড় কর্মকর্তা থেকে মাঝারি পর্যায়ের অনেকেই পালিয়ে যান বা আত্মগোপনে চলে যান। প্রশাসনের ভেতরে কাকে বিশ্বাস করবেন আর কাকে করবেন না—তা ছিলো বড় সংকট।
তিনি জানান, বিদেশে অবস্থানকালে ছাত্রনেতারা তাকে দায়িত্ব নেয়ার আহ্বান জানান। প্রথমে রাজি না হলেও জাতির প্রতি কর্তব্যের কথা বিবেচনা করে তিনি দায়িত্ব নেন। এরপর শুরু হয় দেশকে সচল করার কঠিন কাজ।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে তিনটি প্রধান দায়িত্ব ছিলো—সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন। মানবতাবিরোধী অপরাধ, দুর্নীতি ও অনিয়মের বিচার প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ঊর্ধ্বে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। পাশাপাশি প্রশাসনিক, বাণিজ্যিক ও আর্থিক খাতে সংস্কার কার্যক্রম চালানো হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে কোনও সরকার জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে না পারে।
তিনি আরও বলেন, ভঙ্গুর প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনর্গঠন এবং গণতান্ত্রিক কাঠামোকে শক্তিশালী করাই ছিলো তাদের লক্ষ্য। সর্বোপরি একটি অবাধ, নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ ও বিশ্বাসযোগ্য জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে জনগণের ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
তিনি উল্লেখ করেন, ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচন এবং সাংবিধানিক পরিবর্তন সংক্রান্ত গণভোট দেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে। সারা দেশে ঈদের মতো উৎসবমুখর পরিবেশ ছিলো বলেও জানান তিনি।
ভাষণের শেষাংশে মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, এ নির্বাচন শুধু ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নয়; এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রার নতুন অধ্যায়ের সূচনা। জনগণের রায়ে একটি নতুন বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
১৮ মাসের দায়িত্ব শেষে বিদায়বেলায় তিনি সাফল্য-ব্যর্থতার বিচার জনগণের ওপর ছেড়ে দিয়ে বলেন, তাদের প্রচেষ্টায় কোনও ঘাটতি ছিলো না। এখন দায়িত্ব নির্বাচিত সরকারের হাতে—গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা রক্ষা ও সংস্কারের অগ্রযাত্রা এগিয়ে নেয়ার দায়িত্বও তাদের।
সবার দেশ/কেএম




























