প্রশ্নের মুখে ‘সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশন’
একাদশ নির্বাচন পর্যবেক্ষণে গিয়ে অনুতপ্ত দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষক
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে ফের বিতর্কের মুখে পড়েছে বাংলাদেশ। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের মাধ্যমে টানা তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। তবে নির্বাচন ঘিরে বিরোধী দলের জালিয়াতির অভিযোগ, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগ এবং এবার যুক্তরাজ্যভিত্তিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে ভোটের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে—নির্বাচন পর্যবেক্ষণে অংশ নেওয়া ‘সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশন’ নামের একটি পর্যবেক্ষক সংস্থা এবং তাদের কিছু পর্যবেক্ষক এখন অনুশোচনায় ভুগছেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়াটিই ছিল প্রশ্নবিদ্ধ, পক্ষপাতদুষ্ট এবং অনেকাংশে ভীতিকর।
ভোটের আগেই ব্যালট ভর্তি, জানালেন ফাউন্ডেশনের প্রধান
সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশনের সভাপতি ও সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতি মোহাম্মদ আব্দুস সালাম রয়টার্সকে বলেন, নির্বাচনের আগেই রাতে অনেক কেন্দ্রে ব্যালট বাক্স ভরে ফেলা হয়। আওয়ামী লীগের কর্মীরা ভোটারদের ভয়ভীতি দেখায়। ভোটের দিন বেশ কিছু প্রিসাইডিং অফিসার ও ভোটারদের সঙ্গে কথা বলেই এই ধারণা হয়েছে।
৭৫ বছর বয়সী এ সাবেক বিচারপতি আরও বলেন, আমি এখন মনে করি, নতুন করে নির্বাচন হওয়া দরকার। সুষ্ঠু ভোট হয়নি—এটা বলতে আমার আর কোনো দ্বিধা নেই।
‘ভুল করেছি অংশ নিয়ে’—বিদেশি পর্যবেক্ষকের হতাশা
সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশনের হয়ে কাজ করা কানাডীয় পর্যবেক্ষক টানইয়া ফস্টার বলেন, এখন মনে হচ্ছে, নির্বাচনে পর্যবেক্ষক হিসেবে অংশ না নিলেই ভালো হতো।
তিনি জানান, ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে বিদেশি পর্যবেক্ষক খোঁজার খবর পেয়ে কানাডা থেকে বাংলাদেশে আসেন। তার মেয়ে ক্লোয়ি ফস্টার-ও একই প্যানেলে ছিলেন।
টানইয়া বলেন, আমরা ঢাকার ৯টি কেন্দ্র পর্যবেক্ষণ করেছি। কিন্তু ফাউন্ডেশনের সঙ্গে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা বা ‘সার্ক’-এর সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই—এমন কিছু জানতাম না।
ফাউন্ডেশনের নাম ও পরিচয় ঘিরে বিভ্রান্তি
‘সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশন’ নামের সংস্থাটি দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক জোট SAARC-এর (সার্ক) নাম ও লোগোর সঙ্গে মিল রেখেই আত্মপ্রকাশ করলেও কাঠমান্ডুতে অবস্থিত সার্কের একজন মুখপাত্র রয়টার্সকে স্পষ্ট জানান, আমরা আবেদ আলী কিংবা এই ফাউন্ডেশনের নাম কখনোই শুনিনি। তাদের সঙ্গে সার্কের কোনও সম্পর্ক নেই।
তবে ফাউন্ডেশনের মহাসচিব আবেদ আলী বলেন, তারা সার্কের স্বীকৃতির জন্য আবেদন করেছেন এবং আশা করছেন দ্রুতই অনুমোদন পাবেন।
উপদেষ্টা বোর্ডে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব
রয়টার্সের অনুসন্ধানে জানা যায়, ফাউন্ডেশনের উপদেষ্টা কমিটিতে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্যরা রয়েছেন। এমনকি বিএনপি সরকারের সাবেক একজন মন্ত্রীও প্যানেলে আছেন, যদিও বর্তমান বিরোধী দলের কোনও সদস্য সেখানে নেই।
নির্বাচন পর্যবেক্ষণের বিধিমালা অনুযায়ী, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে এমন সংগঠন নির্বাচন পর্যবেক্ষণে অংশ নিতে পারে না। বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনের তৎকালীন সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ জানান, ফাউন্ডেশনের সঙ্গে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে—এমন তথ্য আমাদের জানা ছিলো না।
আবেদ আলী অবশ্য দাবি করেন, আমাদের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে কেউ জড়িত নয়। বোর্ডে থাকা সংসদ সদস্যরা কেবল মানবিক কার্যক্রমে সহায়তা করেন।
অফিস ছিলো মিরপুরের একটি বেসমেন্টে
রয়টার্সের সাংবাদিকরা জানান, সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশনের প্রধান কার্যালয়টি ছিল ঢাকার মিরপুরে একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের নিচতলায় দুটি ধুলোমাখা কক্ষে।
ফাউন্ডেশনের সভাপতি আব্দুস সালাম বলেন, আমাদের পর্যবেক্ষকরা হাতে গোনা কয়েকটি কেন্দ্র পর্যবেক্ষণ করেছে। এ থেকে সারা দেশের নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু হয়েছে, তা পুরোপুরি বলা সম্ভব নয়। তবে কিছু প্রিসাইডিং অফিসার আমাকে বলেছেন, তাদের বাধ্য করে ব্যালট বাক্স ভরানো হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আমি কোনও রাজনৈতিক স্বার্থে কথা বলছি না। আমি শুধু সত্য প্রকাশ করতে চাই।
বিরোধিতা ও অস্বীকার
ফাউন্ডেশনের মহাসচিব আবেদ আলী অবশ্য সভাপতির বক্তব্যকে নাকচ করে দিয়ে বলেন, কেউ কিছু বলেছে বলে আপনি কি সেটা লিখবেন? এটা গ্রহণযোগ্য নয়।
কিছু পর্যবেক্ষকের অবস্থান অপরিবর্তিত
তবে সব পর্যবেক্ষক অনুতপ্ত নন। কোলকাতার গৌতম ঘোষ, নেপালের হাকিমুল্লাহ মুসলিম ও নাজির মিয়া রয়টার্সকে বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে—এখনও আমরা সে অবস্থানে অটল। গৌতম ঘোষের মন্তব্য, আমি এমন সুন্দর নির্বাচন আগে দেখিনি।
নির্বাচন নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের পর্যবেক্ষণ
এর আগে আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা টিআই জানায়, তারা ৫০টি আসনের মধ্যে ৪৭টিতে অনিয়ম পেয়েছে। তাদের অভিযোগের মধ্যে রয়েছে—জাল ভোট, জোর করে ব্যালট ভর্তি, বিরোধী এজেন্ট ও ভোটারদের বাধা দেয়ার ঘটনা।
তবে ট্রান্সপারেন্সির এ রিপোর্ট সরকার প্রত্যাখ্যান করে এবং প্রধানমন্ত্রীর (ক্ষমতাচ্যুত) উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম মন্তব্য করেন, টিআই হচ্ছে বিএনপির ‘পুতুল’।
আন্তর্জাতিক উদ্বেগ অব্যাহত
নির্বাচন ঘিরে অনিয়মের অভিযোগের প্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ব্রিটেন বারবার তদন্তের দাবি জানিয়ে আসছে।
ভোটের আগে বিদেশি পর্যবেক্ষকদের ভিসা না দেয়ার অভিযোগে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ বাতিল করতে বাধ্য হয় মার্কিন পর্যবেক্ষক দল। তবে সরকার দাবি করে, তারা যথাযথ নিয়ম মেনেই কাজ করেছে।
ফুটনোট:
এই প্রতিবেদনটি মূলত রয়টার্সের দীর্ঘ অনুসন্ধান অবলম্বনে প্রস্তুত করা হয়েছে। এতে ব্যবহৃত বক্তব্যসমূহ সংশ্লিষ্টদের সাথে সরাসরি সাক্ষাৎকার ও পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে সংগৃহীত।
সবার দেশ/কেএম




























