Sobar Desh | সবার দেশ আবু ইউসুফ


প্রকাশিত: ১৯:৫১, ৯ জুন ২০২৫

পতিত আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনের রহস্যময় কৌশল

‘ডেড হর্সে’ হাসিনার বাজি, জোঁকার হামিদের প্রত্যাবর্তন

‘ডেড হর্সে’ হাসিনার বাজি, জোঁকার হামিদের প্রত্যাবর্তন
ছবি: সবার দেশ

৫ আগষ্ট পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফ্যাসিস্ট হাসিনা তথা আওয়ামী লীগের রাজনীতি প্রায় ক্লোজড বললেই চলে। ক্ষমতাচ্যুত সরকারের দখলদার প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে মন্ত্রী, শীর্ষ পর্যায়ের সকল নেতা,  সংসদ সদস্য, আওয়ামী তাবেদার বিচারপতি, সাংবাদিক, শিল্পী-কলাকুশলী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এমনকি মসজিদের খতিব পর্যন্ত দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। গত ৮ মে সাবেক রাষ্ট্রপতি জোঁকার হামিদ চিকিৎসার নামে দেশ ত্যাগ করলেও গতরাতে দেশে ফিরেছেন।

সাবেক এ রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা রহস্যজনক। তার নামে হত্যা মামলা থাকলেও ৮ মে দেশ ছাড়ার সময় সরকারের কোনও সংস্থা তার দেশত্যাগে কোনও বাধা প্রদান করেনি। পরবর্তীতে দেশজুড়ে সমালোচনার প্রেক্ষিতে কিশোরগঞ্জের দুই পুলিশ অফিসারকে সাময়িক সাসপেন্ডও করেছিলো। এটা নিয়েও বিস্তর সমালোচনা হয়। গতরাতে আবদুল হামিদের দেশে ফেরা এবং তাকে গ্রেফতার না করা নিয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার মন্তব্য সে রহস্য আরও ঘনীভূত হয়েছে।

আজকের আলোচনা সেটা নিয়ে নয়। আজকের আলোচনা পতিত আওয়ামীলীগের পূনর্বাসনে জোকার হামিদ কিভাবে হাসিনার 'টেস্ট কেস' হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে তা নিয়ে।

জুলাই বিপ্লবের পর হাসিনা আমলের সব ক্ষমতাসীনরা কেউ আত্মগোপনে, কেউবা জেলখানার চার দেয়ালে বন্দী থাজকেও অশীতিপর বয়োজ্যেষ্ঠ দুই নেতা তোফায়েল আহমেদ ও সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদকে এখনও গ্রেফতার করা হয়নি। বয়স বিবেচনায় অসুস্থ এ দু নেতাকে কোনও প্রকার জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়নি। তারা বহাল তবিয়তেই ছিলেন নিজ নিজ বাসায়। 

শোনা গেছে আবদুল হামিদের শরীরে মরণব্যাধি ক্যানসার বাসা বেঁধেছে। তার চিকিৎসার জন্যই না-কি তিনি সিঙ্গাপুর গিয়েছিলেন। কিন্তু তার সিঙ্গাপুর যাওয়ার পর দেশব্যাপী তীব্র আলোচনা-সমালোচনার পর সরকারও নড়েচড়ে বসে। দু'জন পুলিশ অফিসারকে সাসপেন্ড করে। তখনই অনেকে ধারণা করেছিলেন আবদুল হামিদ যে উদ্দেশ্যেই সিঙ্গাপুর যান না কেনো, তিনি হয়তো আর দেশে ফিরে আসবেন না। উদ্দুদ্ধ রাজনৈতিক পরিবেশ সেরকম ইন্ডিকেটই দিয়েছিলো। কিন্তু অকস্মাৎ আবদুল হামিদের প্রত্যাবর্তন নিয়ে অনেকেই ভাবছেন তবে কি এটা 'মৃত ঘোড়া'র ওপর হাসিনা বাজি ধরেছেন? 

মরণব্যাধী ক্যান্সারে আক্রান্ত বয়োবৃদ্ধ মৃত্যুপথযাত্রী হামিদের ওপর অন্তর্বর্তী সরকার তেমন কঠোর হবেন না অনেকের মতো হাসিনারও বিশ্বাস রয়েছে। যেমনটা হয়নি তোফায়েল আহমেদের ওপর। কিন্তু তার ওপর কি ধরণের আচরণ সরকার করবে সেটা দেখার অপেক্ষায় হাসিনা ও তার দল আওয়ামিলীগ। এটা দেখেই হয়তো তারা তাদের পরবর্তী স্ট্রাটেজি নির্ধারণ করবে। আবদুল হামিদের ওপর কঠিন কোনও ধরণের থেরাপি সরকার কিংবা জনগণের পক্ষ থেকে প্রয়োগ না হলে তারা হয়তো ধীরে ধীরে ডিসেন্ডিং অর্ডারে দেশে ডোকার চেষ্টা করতে পারে।

অন্তর্বর্তী সরকারের রহস্যময় ভূমিকা ও ‘নিষ্ক্রিয় সহায়তা’

সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা থাকলেও ৮ মে তার দেশত্যাগে অন্তর্বর্তী সরকার কিংবা আইন-প্রয়োগকারী কোনো সংস্থা বাধা দেননি। এমনকি এ ব্যাপারে তেমন কোনো নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ছিল না। এ নিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তীব্র সমালোচনা ও রাজনৈতিক আক্রোশ দেখা দেয়। সমালোচনার চাপ সামলাতে কিশোরগঞ্জের দুই পুলিশ অফিসারকে সাময়িক সাসপেন্ড করা হলেও এটি ছিলো এক ধরনের ‘পেছনের চাল’ মাত্র, যা সরকারে অন্তরঙ্গ সিন্ডিকেটের অসুস্থতার দিক নির্দেশ করে।

এ পরিস্থিতি একদিকে যেমন স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচারের প্রতি সরকারের দায়বদ্ধতার অভাব প্রকাশ করে, অন্যদিকে এটি অস্পষ্ট রাজনৈতিক কৌশল ও ক্ষমতার অপব্যবহারের গোপন আভাসও দেয়। বিশেষ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার মন্তব্যগুলো এ রহস্যকে আরও জটিল করে তোলে, যেখানে বলা হয়, হামিদের গ্রেফতারের বিষয়ে এখনও সিদ্ধান্ত হয়নি। এমন ‘অস্বচ্ছতা’ বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অন্ধকার দিককে তুলে ধরে।

‘জোঁকার হামিদ’ এবং হাসিনার ‘টেস্ট কেস’

৫ আগস্টের ‘বিপ্লব’ পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেখা গেছে, হাসিনা আমলের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের মধ্যে একগুচ্ছ পালিয়ে গেছে, অন্যরা জেলখানায় আটকা পড়েছে। তবে বয়োজ্যেষ্ঠ দুই নেতা—তোফায়েল আহমেদ ও সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ—যারা অসুস্থ ও প্রবীণ, তাদের এখনও গ্রেফতার করা হয়নি। তারা দেশে রয়েছেন, যদিও তার রাজনৈতিক প্রভাব আজকাল প্রায় শেষপ্রান্তে।

আব্দুল হামিদের শরীরে মরণব্যাধি ক্যানসার বাসা বেঁধেছে বলে শোনা যায়, তার চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে যাওয়ার পেছনে ছিলো রাজনৈতিক এক গভীর ষড়যন্ত্র। প্রথমদিকে তার বিদেশ যাত্রাকে সরকারের অনেকেই নীরব সায় দিয়েছেন, যা একটি ভয়ংকর রাজনৈতিক সংকেত ছিলো। সরকারি আধিকারিকদের সাসপেন্ড করা এবং বিরোধীদের প্রতিবাদের মাঝে হামিদের দেশে ফেরার ঘোষণা আসাটা রাজনৈতিক নাটকীয়তার ইঙ্গিত বহন করে।

বিশ্লেষকদের মতে, হামিদের প্রত্যাবর্তন আসলে হাসিনার পতিত আওয়ামী লীগের ‘পুনর্বাসন’ কৌশলের একটি ‘টেস্ট কেস’। একটি মৃত ঘোড়ার ওপর বাজি ধরে, যার রাজনৈতিক প্রভাব নষ্ট হয়ে গেছে, কিন্তু যার ব্যবহার করে দলটা হয়তো কিছুদিন টিকে থাকতে চায়।

হাসিনা ও আওয়ামী লীগের রাজনীতির অন্ধকার চেহারা

হাসিনা ও তার দল আজ রাজনৈতিক নিপীড়ন, শাসনহীনতা ও ক্রীড়াপ্রধান রাজনীতির অন্যতম চরম প্রতীক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলো। ক্ষমতা ধরে রাখতে তারা যেনো দেশের সব প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের অনুগত বানানোর চেষ্টা চালিয়েছে। বিচার বিভাগ থেকে শুরু করে প্রশাসন, পুলিশ, সামরিক বাহিনী, সংবাদমাধ্যম, বিশ্ববিদ্যালয়—সব জায়গায় একরূপ শাসন ও দমন নীতি চালু করেছিলো তারা।

সর্বত্র ভোটবিহীন, গণতন্ত্রহীন শাসনের পরিসংখ্যান সামনে এসেছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের গ্রেফতার, নির্যাতন ও নির্বাসনের ঘটনা প্রতিদিনকার সংবাদে পরিণত হয়েছে। এ ‘ফ্যাসিস্ট’ শাসনের কারণে দেশের সর্বস্তরের মানুষ ছিলো ভীত, নিঃশব্দ ও নিরাশ্রয়।

আওয়ামী লীগের পতিত রাজনীতির আরেকটি দিক হলো ক্ষমতার জন্য তারা দেশকে যেন এক বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠীতে পরিণত করা, যেখানে গণতান্ত্রিক অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ছিলো না বললেই চলে। নেতারা নিজেদের আত্মস্মৃতিচারণায় এবং ক্ষমতার লড়াইয়ে মগ্ন, দেশের গরীব জনগণ ও সাধারণ মানুষ পেছনে পড়ে যাচ্ছে।

‘ডেড হর্সে’ বাজি ও ভবিষ্যৎ কৌশল

হাসিনার দলের জন্য এ ‘ডেড হর্সে’ বলতে পারেন সে বয়োজ্যেষ্ঠ নেতাদের, যাদের রাজনৈতিক প্রভাব আজ প্রায় মৃতপ্রায় হলেও তারা দলকে ধীরেধীরে পুনরুদ্ধারের পথ দেখাতে পারে। এ বাজিতে হাসিনা ও তার নেতারা এখনো নিশ্চিত নন যে পরবর্তী রাজনীতির চিত্র কেমন হবে। আবদুল হামিদের ওপর সরকারের আচরণ ও তার অবস্থান নির্ধারণ করবে দলটির ভবিষ্যৎ পথ।

বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি সরকার তার ওপর কঠোর কোনো পদক্ষেপ না নেয়, তবে এটা হবে একটি সুস্পষ্ট সংকেত যে আওয়ামিলীগ ধীরে ধীরে পুরানো নেতাদের ধাপে ধাপে দেশে ফিরিয়ে নিয়ে আসার চেষ্টা করছে। এটি হতে পারে ধীরে ধীরে পুনর্গঠনের একটি ধাপ।

রাজনৈতিক পুনর্বাসনের সঙ্গে গণতন্ত্রের অবক্ষয়

জোঁকার হামিদের প্রত্যাবর্তনের ঘটনা আমাদের শেখায় যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এখনও বড় ধরনের ‘রোটেশন’ কিংবা নতুন নেতৃত্ব গঠনের কোনও সুযোগ নেই। বরং পুরনো নেতাদের প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে একটি বর্ণিল পুনর্বাসনের খেলা চলছে, যা দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে অবমূল্যায়িত করছে।

জনগণের রাজনৈতিক চেতনা ও আশা-আকাঙ্ক্ষা ম্লান হয়ে যাচ্ছে। ক্ষমতা কাঙ্খিত হলেও সেটা কোনো নতুন নীতির জন্য নয়, বরং পুরনো রাজনৈতিক দলের জন্য শক্তি পুনরুদ্ধারের নামে আবারও দমন, নিপীড়ন ও ক্ষমতার অপব্যবহার বৃদ্ধি করার কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কী?

আব্দুল হামিদের দেশে প্রত্যাবর্তন কোনও সাধারণ ঘটনা নয়, বরং এটি একটি গভীর রাজনৈতিক সংকেত, যেখানে পতিত আওয়ামী লীগ ক্ষমতা পুনর্বাসনের জন্য নীরব একটি কৌশল গ্রহণ করেছে। ‘ডেড হর্সে’ হাসিনার বাজি হিসেবে এ ঘটনাটি বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য এক ভয়াবহ বাস্তবতা তুলে ধরছে।

দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এ ‘টেস্ট কেসে’র ফলাফলের ওপর। যদি সরকারের পদক্ষেপ কঠোর না হয়, তবে পুরনো নেতাদের ফেরা দেশকে নতুন করে দমন-পীড়নে নিয়ে যেতে পারে, আর গণতন্ত্রের সূচনা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। অন্যদিকে, কঠোর পদক্ষেপ নিতে না পারলে দেশের রাজনীতি আরও নীরব, বিষাক্ত ও হতাশাজনক হয়ে উঠবে।

এ প্রেক্ষাপটে দেশের সচেতন জনগণ, গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রয়োজন সতর্ক ও সক্রিয় থাকা, কারণ দেশের গণতন্ত্র ও সাম্যবাদের ভবিষ্যৎ এ ‘ডেড হর্সে’ বাজির খেলায় রয়েছে।

তবে বাস্তবতা হলো, ফ্যাসিস্ট হাসিনা এখন নিজেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘ডেড কেস’। তার জন্য ‘ডেড হর্স’ আর ‘লাইভ হর্স’ তেমন কোনও পার্ধ্যক্য বয়ে আনবে না। হার গেম ইজ ওভার ফরএভার।

সবার দেশ/কেএম

শীর্ষ সংবাদ:

পাঁচ অস্ত্রসহ গ্রেফতার লিটন গাজী সম্পর্কে সব জানালো পুলিশ সুপার
আনসার ভিডিপি ব্যাংকের ৯ কোটি টাকা আত্মসাৎ, ব্যবস্থাপক গ্রেফতার
লালমনিরহাটে স্বামী হত্যা মামলায় স্ত্রী ও পরকীয়া প্রেমিকের যাবজ্জীবন
ভোলাহাটে বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে কলেজ শিক্ষকের মৃত্যু
সৌদি আরবে প্রবাসী বাংলাদেশিরা দালাল চক্রের খপ্পরে
বাংলাদেশ সীমান্তে পঁচছে ৩০ হাজার টন ভারতীয় পেঁয়াজ
সুদের টাকার জন্য নোয়াখালীতে ব্যবসায়ীকে পিটিয়ে হত্যা, গ্রেফতার-১
ইমরান খান বেঁচে আছেন, দেশ ছাড়তে চাপ: পিটিআই
হাসিনা-রেহানা-টিউলিপের প্লট দুর্নীতি মামলার রায় আজ
শুরু হলো বিজয়ের মাস
বিডিআর হত্যাকাণ্ডে ভারত জড়িত
খালেদা জিয়ার খোঁজ নিতে হাসপাতালে জামায়াত সেক্রেটারি
স্কুল ভর্তির লটারি ১১ ডিসেম্বর
বিডিআরকে দুর্বল করে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখাতেই পিলখানা হত্যাকাণ্ড
ছয় উপসচিবের দফতর পরিবর্তন