যুদ্ধের কিনারায় পারস্য উপসাগর
যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে শক্তিশালী কার্ড নিয়ে নেমেছে ইরান
পারস্য উপসাগরে উত্তেজনা নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ পথ হরমুজ প্রণালী সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়ার ঘোষণা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী কৌশলগত কার্ড নিয়ে মাঠে নেমেছে ইরান। এ পদক্ষেপে বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে অস্থিরতার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
তেহরানের এমন হুমকির মধ্যেই জেনেভায় ওমানের মধ্যস্থতায় দুই দেশের মধ্যে রুদ্ধদ্বার পরোক্ষ আলোচনা চলছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি সতর্ক করে দিয়েছেন, মার্কিন রণতরী ধ্বংস করার সামরিক সক্ষমতা ইরানের রয়েছে। এতে পরিস্থিতি আরও অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও শক্ত অবস্থান নিয়েছে। পারস্য উপসাগরে মোতায়েন করা হয়েছে দুটি ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ। এর মধ্যে রয়েছে USS Abraham Lincoln এবং বিশ্বের বৃহত্তম যুদ্ধজাহাজগুলোর একটি USS Gerald R. Ford। মার্কিন প্রশাসনের দাবি, এটি শক্তির মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠার কৌশলের অংশ। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন হুঁশিয়ারি দিয়েছে—ইরান যদি দ্রুত পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে সমঝোতায় না আসে, তবে ফল হবে ‘বেদনাদায়ক’।
ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিও অস্থির। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও মুদ্রাস্ফীতির জেরে দেশজুড়ে সরকারবিরোধী আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। তেহরান একে ‘আমেরিকান-জায়নবাদী ষড়যন্ত্র’ হিসেবে আখ্যা দিলেও বিশ্লেষকদের মতে, এ অভ্যন্তরীণ চাপ জেনেভার আলোচনায় ইরানের দর কষাকষির ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে।
আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার। ইরান চায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার অক্ষুণ্ণ রেখে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হোক। কিন্তু ওয়াশিংটন চাইছে আলোচনায় ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থনের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত হোক। এ অনড় অবস্থান আলোচনাকে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের মিত্র হিজবুল্লাহ ও হামাস সাম্প্রতিক সংঘাতে দুর্বল হয়েছে। লেবাননে ইসরায়েলি অভিযানের পর হিজবুল্লাহর অবস্থান আগের মতো শক্ত নেই। তবে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী ও ইরাকি মিলিশিয়াদের মাধ্যমে ইরান এখনও প্রভাব ধরে রাখার চেষ্টা করছে। আঞ্চলিক এ ছায়াযুদ্ধ ধীরে ধীরে সরাসরি ইরান-ইসরায়েল মুখোমুখি অবস্থানে রূপ নিচ্ছে।
গত বছরের জুনে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে ১২ দিনের সংক্ষিপ্ত কিন্তু তীব্র যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। ওই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ইসরায়েলের পক্ষে অবস্থান নেয় এবং ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়। এরপর থেকেই দুই দেশের মধ্যে আস্থার সংকট গভীর হয়।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালী বন্ধের হুমকিকে ইরান ‘শেষ অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে। কারণ এ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি তেল পরিবাহিত হয়। এটি বন্ধ হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যেতে পারে, যার প্রভাব পড়বে ইউরোপ থেকে এশিয়া—সবখানেই।
উপসাগরীয় দেশগুলো—সৌদি আরব, কাতার ও কুয়েত—পরিস্থিতি গভীর উদ্বেগের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে। তারা কোনওভাবেই পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ চায় না। ঐতিহ্যগত মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ওমান দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা গড়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
এখন প্রশ্ন একটাই—জেনেভা সংলাপ কি উত্তেজনা কমাবে, নাকি পারস্য উপসাগর নতুন যুদ্ধের দাবানলে জ্বলবে? একদিকে ট্রাম্পের সামরিক হুঁশিয়ারি, অন্যদিকে খামেনির আপোষহীন অবস্থান। এ দ্বিমুখী চাপের মধ্যে হরমুজ প্রণালীই হয়ে উঠেছে ভূ-রাজনীতির সবচেয়ে বড় তুরুপের তাস।
সূত্র: এনডিটিভি
সবার দেশ/কেএম




























