নিউ ইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণ
একদলীয় শাসনের পথে ভারত? বিজেপির সর্বগ্রাসী উত্থান
একসময় ‘কংগ্রেসমুক্ত ভারত’ গড়ার যে রাজনৈতিক স্লোগান দিয়েছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, এক দশক পর সেটিই যেনো বাস্তব রূপ নিতে শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম Tদ্য নিউইয়র্ক টাইমস–এর এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্র এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে মোদিবিরোধী শক্তিগুলো কার্যত কোণঠাসা হয়ে পড়েছে এবং দেশটি ধীরে ধীরে একদলীয় আধিপত্যের দিকে এগোচ্ছে।
২০১৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগে বিজেপির হয়ে প্রচারণায় নেমে মোদি বলেছিলেন, তিনি এমন এক ভারত গড়তে চান যেখানে কংগ্রেসের কোনও প্রভাব থাকবে না। সে সময় অনেকেই এটিকে কেবল নির্বাচনি স্লোগান মনে করেছিলেন। কিন্তু এক দশকের বেশি সময় পর বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র দেখাচ্ছে।
২০১৪ সালের নির্বাচনে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী দল ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস পার্লামেন্টে ২০৬ আসন থেকে নেমে মাত্র ৪৪ আসনে পৌঁছে যায়। এরপর দলটি আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। রাজ্য পর্যায়েও তাদের প্রভাব দ্রুত কমে আসে। বর্তমানে মোদির নেতৃত্বাধীন জোট ভারতের ২১টি রাজ্যে ক্ষমতায় রয়েছে, বিপরীতে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে মাত্র চারটি রাজ্য।
কংগ্রেস দুর্বল হয়ে পড়ার পর ভারতের আঞ্চলিক দলগুলোই বিজেপির প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়। বিশেষ করে মমতা ব্যানার্জি এবং এমকে স্ট্যালিন ছিলেন মোদিবিরোধী রাজনীতির সবচেয়ে শক্তিশালী মুখ।
কিন্তু সাম্প্রতিক নির্বাচনে এ দুই নেতারই পরাজয় ভারতের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এর ফলে মোদি এখন এমন এক অবস্থানে পৌঁছেছেন যেখানে জাতীয় রাজনীতিতে কার্যকর বিরোধী শক্তি প্রায় অনুপস্থিত।
ভারতের স্বাধীনতার পর প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু যে বহুত্ববাদী রাষ্ট্রচিন্তার ভিত্তি গড়ে দিয়েছিলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সেটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির বৈচিত্র্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ভারতের জায়গায় বিজেপি একটি রক্ষণশীল হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রকাঠামো প্রতিষ্ঠার দিকে এগোচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বিজেপির সাংগঠনিক শক্তি ও আদর্শিক দৃঢ়তাই দলটিকে অন্যদের তুলনায় এগিয়ে দিয়েছে। সারা দেশের হিন্দু ভোটকে এক প্ল্যাটফর্মে আনার কৌশল দীর্ঘদিন ধরেই অনুসরণ করে আসছে দলটি। পাশাপাশি ব্যবসাবান্ধব ভাবমূর্তি এবং শক্তিশালী নির্বাচনি যন্ত্রও তাদের বড় শক্তি।
২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিজেপি ধাক্কা খেলেও দ্রুত ঘুরে দাঁড়ায়। সে সময় দীর্ঘস্থায়ী বেকারত্ব, বৈষম্য ও অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে বিরোধীরা মোদির তীব্র সমালোচনা করেছিলো। বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট মোট ভোটের ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ পায়। তবুও আঞ্চলিক দুই দলের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করতে সক্ষম হয় তারা।
রাজনৈতিক ভাষ্যকার সুগত শ্রীনিবাস বলেন, ২০২৪ সালে মোদি ছিলেন আহত বাঘের মতো। এরপর তিনি ঠান্ডা মাথায় প্রতিশোধ নিতে শুরু করেন।
তারপর থেকেই বিজেপি ঘরে ঘরে গিয়ে নতুন ভোটার সংগঠিত করার কাজ শুরু করে। একই সঙ্গে রাজ্যভিত্তিক নির্বাচনে জয়ের জন্য দলটি কৌশলগতভাবে মনোযোগ বাড়ায়। কেন্দ্রীয় সরকারের বড় বড় বিতর্কিত প্রকল্পের বদলে স্থানীয় জনকল্যাণমূলক ইস্যু সামনে আনা হয়।
এর ফলও দ্রুত আসে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে হরিয়ানায় জয়ের সম্ভাবনা কংগ্রেসের দিকে থাকলেও শেষ পর্যন্ত বিজেপি জয় পায়। পরে মহারাষ্ট্রতেও বড় বিজয় ছিনিয়ে নেয় দলটি।
বিরোধীরা অবশ্য নির্বাচনি কারচুপি, ভোট কেনাবেচা এবং ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেয়ার অভিযোগ তোলে। বিজেপি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
২০২৫ সালে বিজেপি ২৭ বছর পর রাজধানী নয়াদিল্লিতেও জয়লাভ করে। পরাজিত হন অরবিন্দ কেজরিওয়াল, যিনি দীর্ঘদিন ধরে মোদির অন্যতম বড় সমালোচক ছিলেন।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বিহার ও পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে ব্যাপক সংখ্যক নাম বাদ পড়েছে। বিশেষ করে মুসলিম সংখ্যালঘুদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ৯০ লাখ নাম বাদ পড়ে এবং অন্তত ২৭ লাখ ভোটার ভোট দিতে পারেননি বলে দাবি করা হয়।
এমন পরিস্থিতিতে বিজেপি আবারও হিন্দু ভোটকে একত্রিত করতে সক্ষম হয়। পশ্চিমবঙ্গে মমতা ব্যানার্জির পরাজয়কে শুধু ভোটার অসন্তোষ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না বলে মত বিশ্লেষকদের। তারা বলছেন, পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা এবং ধর্মীয় মেরুকরণ— দুইয়ের সমন্বয়েই বিজেপির বড় জয় এসেছে।
কোলকাতার এক জুস বিক্রেতা শিবু সিংহ বলেন, আগে তিনি মমতাকে ভোট দিলেও এখন তার মনে হয়েছে সরকার মুসলিমদের বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান ও শিল্পায়নের অভাবেও তিনি হতাশ।
অন্যদিকে দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ুতে অর্থনীতি দ্রুত বাড়লেও [দ্রাবিড় মুনেত্র কাজাগাম (ডিএমকে) নেতা স্ট্যালিন নির্বাচনে বড় পরাজয়ের মুখে পড়েন। সেখানে জনপ্রিয় অভিনেতা বিজয় থালাপতির রাজনৈতিক দল সবচেয়ে বেশি ভোট পায়।
নয়াদিল্লিভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক আরতি জেরথ মনে করেন, বিজেপির নির্বাচনি যন্ত্র অত্যন্ত সুসংগঠিতভাবে কাজ করেছে। তার ভাষায়, তারা প্রতিটি নির্বাচনি এলাকা ও ভোটারগোষ্ঠীর দুর্বলতা বিশ্লেষণ করেছে এবং কোথায় বিরোধীদের সমর্থন ভাঙা সম্ভব, সেটি লক্ষ্য করে পরিকল্পনা নিয়েছে।
এখন রাহুল গান্ধী একটি দুর্বল বিরোধী জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। অনেক বিশ্লেষক বলছেন, ২০১৪ সালে মোদি যে রাজনৈতিক বাস্তবতার স্বপ্ন দেখেছিলেন, ভারত এখন ঠিক সে দিকেই এগোচ্ছে।
তবে উদ্বেগও বাড়ছে। রাজনৈতিক ভাষ্যকার সুগত শ্রীনিবাস রাজু সতর্ক করে বলেছেন, কেউই একদলীয় শাসন চায় না। গণতন্ত্র টিকে থাকে শক্তিশালী বিরোধী দলের উপস্থিতির মাধ্যমে। ভারতের এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন একটি কার্যকর বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি।
সবার দেশ/কেএম




























