অনড় তেহরান, সমাধান অনিশ্চিত
ধ্বংসস্তূপের চাপে আলোচনায় ট্রাম্প—ইরানকে ১৫ দফা শান্তি প্রস্তাব
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত ঘিরে চাপে পড়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একদিকে সামরিক উত্তেজনা বাড়ছে, অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান ব্যয় ও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে এখন যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছে যুক্তরাষ্ট্র। এমন পরিস্থিতিতে ইরানের কাছে ১৫ দফা শান্তি প্রস্তাব পাঠিয়েছে ওয়াশিংটন, তবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি।
সম্প্রতি ইরানের বৈদ্যুতিক স্থাপনায় হামলার হুমকি দিলেও পরে অবস্থান পরিবর্তন করে ট্রাম্প দাবি করেন, দুই দেশের মধ্যে ফলপ্রসূ আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে এ দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। উল্টো তারা ইসরায়েলের বিভিন্ন শহরে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে।
ইরানের হামলায় তেল আবিবসহ বিভিন্ন এলাকায় সতর্ক সাইরেন বেজে ওঠে। বহুতল ভবনে আঘাত হানা ক্ষেপণাস্ত্রে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। একই সময়ে ইসরায়েলও ইরান, লেবানন ও অন্যান্য স্থানে পাল্টা হামলা অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এ সংঘাত এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া যেমন ব্যয়বহুল, তেমনি দ্রুত সমাধানও কঠিন। ফলে ট্রাম্প প্রশাসন কৌশল বদলে আলোচনার দিকে ঝুঁকছে।
১৫ দফা প্রস্তাবের মূল শর্ত
যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত ১৫ দফা পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ এবং গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখা।
প্রস্তাব অনুযায়ী, ইরানকে সম্পূর্ণভাবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে এবং ইতোমধ্যে সমৃদ্ধ করা ইউরেনিয়াম হস্তান্তর করতে হবে। পাশাপাশি দেশটির পারমাণবিক অবকাঠামো ভেঙে ফেলতে এবং ভবিষ্যতে কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার প্রতিশ্রুতি দিতে হবে।
এছাড়া ইরানের ভূখণ্ডে কোনও ধরনের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম চলবে না—এমন শর্তও রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি সবসময় উন্মুক্ত রাখতে হবে, যাতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে কোনও বিঘ্ন না ঘটে।
বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে ইরানের আংশিক অবরোধের কারণে ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে।
আলোচনায় কারা
এ আলোচনায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার। এছাড়া ভাইস প্রেসিডেন্ট, পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারাও আলোচনায় যুক্ত রয়েছেন।
তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এ আলোচনায় সরাসরি অংশ নিচ্ছে না ইসরায়েল, যদিও যুদ্ধের অন্যতম প্রধান পক্ষ তারা।
মধ্যস্থতায় চীন, পাকিস্তান ও ভারত
সংঘাত থামাতে আন্তর্জাতিক উদ্যোগও জোরদার হয়েছে। চীন ইতোমধ্যে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছে। একই সঙ্গে শাহবাজ শরিফ জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সম্মত হলে শান্তি আলোচনার জন্য পাকিস্তান মধ্যস্থতা করতে প্রস্তুত।
পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনীর এ বিষয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করেছেন বলেও জানা গেছে।
অন্যদিকে নরেন্দ্র মোদি ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলে শান্তি ও স্থিতিশীলতার পক্ষে কাজ চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন।
সমাধান এখনও দূরে
তবে এত উদ্যোগের পরও বাস্তবসম্মত সমাধান এখনও অনেক দূরে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে কি না, আর ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করবে কি না—এ প্রশ্নগুলোর স্পষ্ট উত্তর এখনও নেই।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছেন, তারা শুধু যুদ্ধবিরতি নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি ও পূর্ণাঙ্গ সমাধান চান।
অন্যদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছেন।
সব মিলিয়ে, যুদ্ধক্ষেত্রে তীব্র সংঘর্ষ চললেও কূটনৈতিক অঙ্গনে চলছে সমাধান খোঁজার চেষ্টা। তবে শর্তের কঠোরতা ও পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে সে সমাধান এখনো অনিশ্চয়তার দোলাচলে রয়ে গেছে।
সবার দেশ/কেএম




























