বিসিবি কি মন্ত্রী-এমপিদের সন্তানদের ক্লাবে পরিণত হচ্ছে?
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) নতুন পরিচালনা পর্ষদের তালিকা প্রকাশের পর ক্রিকেট অঙ্গনে নতুন এক আলোচনা শুরু হয়েছে। জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবালের নেতৃত্বে গঠিত নতুন বোর্ডে ক্রিকেট সংগঠকদের পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতি বিসিবির ভবিষ্যৎ কাঠামো ও স্বাধীনতা নিয়ে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
অ্যাডহক কমিটির সফল দায়িত্ব পালনের পর নির্বাচনের মাধ্যমে বিসিবির ১৭তম সভাপতি হয়েছেন তামিম ইকবাল। ক্লাব ক্যাটাগরিতে রেকর্ড ৭৩ ভোট পেয়ে পরিচালক নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি সর্বসম্মতিক্রমে বোর্ড প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তবে সভাপতি নির্বাচনকে ছাপিয়ে এখন আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে নতুন পরিচালনা পর্ষদের পারিবারিক ও রাজনৈতিক সংযোগ।
ক্লাব ক্যাটাগরিতে নির্বাচিত পরিচালকদের তালিকায় দেখা যায়, বর্তমান সরকারের অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ছেলে ইসরাফিল খসরু ৭২ ভোট পেয়ে পরিচালক হয়েছেন। একই সংখ্যক ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের ছেলে সাঈদ ইব্রাহিম আহমেদ।
এছাড়া বসুন্ধরা রাইডার্সের কাউন্সিলর মির্জা ইয়াসির মোহাম্মদ ফয়সাল হলেন কুমিল্লা-৯ আসনের বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য আবুল কালামের ছেলে। আজাদ স্পোর্টিংয়ের কাউন্সিলর ইয়াসির আব্বাস হলেন ঢাকা-১০ আসনের সংসদ সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা মির্জা আব্বাসের ছেলে। শাইনপুকুর ক্রিকেট ক্লাবের প্রতিনিধি আসিফ রব্বানি বগুড়া-৫ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম সিরাজের ছেলে।
জেলা ও বিভাগীয় ক্যাটাগরিতেও একই চিত্র দেখা গেছে। ঢাকা বিভাগের পরিচালক সাঈদ বিন জামান হলেন বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাতের ছেলে। চট্টগ্রাম বিভাগের পরিচালক মঈন উদ্দিন চৌধুরী বর্তমান পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানির চাচা। রংপুর বিভাগ থেকে নির্বাচিত ফয়সল আমীন হলেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ছোট ভাই। রাজশাহী বিভাগের পরিচালক মীর শাকরুল আলম স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর ছেলে।
অন্যদিকে খুলনা বিভাগ থেকে নির্বাচিত শান্তনু ইসলাম হলেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের সহোদর। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের মনোনীত পরিচালকদের মধ্যেও রয়েছে রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের প্রতিনিধিত্ব।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের প্রায় সব ক্রিকেট বোর্ডেই ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততা নতুন কিছু নয়। তবে বিসিবির নতুন বোর্ডে রাজনৈতিক পরিবারের সদস্যদের সংখ্যাধিক্য ক্রিকেট প্রশাসনের সিদ্ধান্ত গ্রহণে কতটা প্রভাব ফেলবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
অবশ্য বোর্ডের সমর্থকদের দাবি, অধিকাংশ নির্বাচিত পরিচালক নিজ নিজ ক্লাব, জেলা বা ক্রীড়া সংগঠনের প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। তাদের পারিবারিক পরিচয়ের চেয়ে প্রশাসনিক দক্ষতা ও ক্রিকেট উন্নয়নে ভূমিকা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে সভাপতি তামিম ইকবাল ইতোমধ্যে বোর্ডে পদের দ্বন্দ্ব ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল এড়ানোর বার্তা দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, ক্রিকেটের স্বার্থে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে এবং বিসিবিকে আরও পেশাদার ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করাই হবে নতুন বোর্ডের প্রধান লক্ষ্য।
তবে নতুন পরিচালনা পর্ষদের গঠন দেখে অনেকের মনেই প্রশ্ন—এটি কি সত্যিই ক্রিকেট সংগঠকদের বোর্ড, নাকি ধীরে ধীরে মন্ত্রী-এমপি ও প্রভাবশালী পরিবারের উত্তরাধিকারীদের এক নতুন ক্ষমতার কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে?
আগামী চার বছরে বিসিবির কার্যক্রম, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং ক্রিকেট উন্নয়নের বাস্তব ফলাফলই হয়তো এ প্রশ্নের উত্তর দেবে।
সবার দেশ/কেএম




























