ঠাকুরগাঁওয়ের তামান্না: সাহসী সে নারী যিনি ভয়কে জয় করেছিলেন
ঠাকুরগাঁওয়ের আন্দোলনের সে সাহসী ভিডিও ক্লিপের কথা নিশ্চয়ই কারও ভোলার কথা নয়। আঙ্গুল উঁচিয়ে চোখ রাঙিয়ে ক্ষমতার সামনে দাঁড়ানো সে নারীর নাম তামান্না। তিনি ঠাকুরগাঁওয়ের মেয়ে, একেবারে ভূমিপুত্রের মতোই এ মাটি-মানুষের সঙ্গে মিশে থাকা এক সাহসী কণ্ঠ।
১৬ জুলাই ঠাকুরগাঁওয়ের চৌরাস্তায় যখন ছাত্র-জনতার আন্দোলন শুরু হয়, তখন থেকেই মাঠে ছিলেন তামান্না। তার বান্ধবী সোহানা ইসলাম সমাপ্তিকে সঙ্গে নিয়ে নারীদের সংগঠিত করেন। একটি মেসেঞ্জার গ্রুপ খুলে সবাইকে যুক্ত করেন, পরিকল্পনা করেন আন্দোলনের কৌশল।
আন্দোলনের সে দিনগুলোতে তামান্না ও তার বান্ধবীরা খেয়ে না খেয়ে বাসায় ছিলেন, দিনের বেলায় ময়দানে, রাতে আন্দোলনের পরিকল্পনায় ব্যস্ত থাকতেন। কিন্তু পরিবারের চাপ বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত ১৮ জুলাই ঠাকুরগাঁও বাসস্ট্যান্ডে পুলিশ গুলি চালালে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। রাতেই কারফিউ জারি হয়। বাধ্য হয়ে বাবার সঙ্গে গ্রামে ফিরে যান তামান্না।
কিন্তু ঘরে বসে থাকতে পারেননি তিনি। আবু সাইদের নির্মম মৃত্যুর দৃশ্য, আন্দোলনের উত্তাল ঢেউ তাকে আবার মাঠে টেনে আনে। গ্রাম থেকে ১২ কিলোমিটার পথ, পকেটে একটাও টাকা নেই। অনেক জোর করে বড় বোনের কাছ থেকে ১০০ টাকা নিয়ে বেরিয়ে পড়েন।
৩১ জুলাই ঠাকুরগাঁও কোর্ট প্রাঙ্গণে পৌঁছাতেই পুলিশ বাধা দেয়। বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে পুলিশের হাত পড়ে নারীদের গায়ে। তখনই নেতৃত্বে উঠে আসেন তামান্না-সমাপ্তিরা। ব্যারিকেডের সামনে বসে পড়েন তারা। চারপাশে সাদা পোশাকের গোয়েন্দা নজরদারি।
সে সময় ছোট ভাই সাব্বির প্রভাতের লেখা স্লোগান মুখে নিয়ে তামান্না দাঁড়িয়ে যান,
‘কে এসেছে কে এসেছে — পুলিশ এসেছে পুলিশ এসেছে, কি করছে কি করছে — স্বৈরাচারের পা চাটছে।’
এ দৃশ্যের ভিডিও ভাইরাল হয় মুহূর্তেই। পুলিশের হুমকি, গ্রেফতারের ভয় কোনো কিছুই দমাতে পারেনি তাকে। তিনি সেদিন বলেন, আমি কোনো অন্যায় করিনি। প্রয়োজনে জেলে নিয়ে যান। দাবি আদায় না করে আমি মাঠ ছাড়বো না।

নিজের গল্প বলতে গিয়ে তামান্না বলেন, বিশ্বাস করবেন না ভাই, আমার এক বিন্দু ভয়ও হচ্ছিলো না। তখন যদি গুলি করতো, আমার কোনও আফসোস থাকতো না। আমার অনুপ্রেরণা ছিলেন আবু সাইদ ভাই।
এ প্রশ্ন এখন অনেকের — কতটুকু দেশপ্রেম আর সাহস থাকলে বন্দুকের সামনে দাঁড়ানো যায়?
আন্দোলনের সে তামান্নারা আজ ঘরে ফিরে গেছেন। কারণ, আজও তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়নি। ছাত্রলীগের অনুসারীরা এখনও তাদের খুঁজে বেড়ায়, পুলিশের কাছ থেকে আশ্বাস ছাড়া কিছু মেলে না।
সবচেয়ে দুঃখজনক, দেশের জন্য, নারীসমাজের জন্য যারা মাঠে নেমেছিলেন, তাদের অবদানকে এখনও যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি। অথচ তামান্নাদের কয়েক সেকেন্ডের সাহসী ভিডিওই হাজার হাজার নারীর বুকের ভেতর সাহস জাগিয়েছিলো।
তামান্না এখন ব্যক্তিজীবনে মনোযোগী। ফেসবুকসহ কোনও সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয় নন তিনি। তবু তার সাহসের গল্প বেঁচে আছে মানুষের হৃদয়ে, ভিডিও ফুটেজে, ইতিহাসের পাতায়।
পুনশ্চ: তার মতো সাহসীদের মূল্যায়ন করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব, কালের ভিড়ে তাদের হারিয়ে যেতে দেয়া নয়।
সবার দেশ/কেএম




























