সমঝোতার ফাঁদে শরিকরা, বিদ্রোহী প্রার্থীতে বিপাকে
ভোটের মাঠে বিএনপির মিত্রদের অসহায়ত্ব
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকারবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোকে নিয়ে করা আসন সমঝোতা বিএনপির জন্য যেমন চ্যালেঞ্জ, তেমনি মিত্র দলগুলোর জন্য হয়ে উঠেছে বড় অস্বস্তির কারণ। ভোটের মাঠে নেমে দেখা যাচ্ছে, সমঝোতায় ছেড়ে দেয়া আসনগুলোর বেশির ভাগেই বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী সক্রিয় থাকায় কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন জোট শরিকদের প্রার্থীরা।
জানা গেছে, বিএনপি মিত্র দলগুলোর জন্য আটটি আসন ছেড়ে দিলেও একটি বাদে সাতটিতেই দলটির বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন। ফলে এসব আসনে বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের একটি বড় অংশ মিত্র প্রার্থীদের পক্ষে সক্রিয় না হয়ে বিদ্রোহীদের সঙ্গে কাজ করছেন। এতে ভোটের মাঠে শরিক প্রার্থীরা পড়েছেন দ্বিমুখী চাপের মধ্যে।
একই সঙ্গে কয়েকটি ছোট দলের শীর্ষ নেতা নিজেদের দল ভেঙে বা ত্যাগ করে বিএনপিতে যোগ দিয়ে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করলেও তারাও স্বস্তিতে নেই। ছয়টি আসনের মধ্যে চারটিতেই তাদের বিপরীতে রয়েছেন স্বতন্ত্র বা বিদ্রোহী প্রার্থী, যাদের পেছনে রয়েছে বিএনপির তৃণমূলের সমর্থন।
এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, বিএনপি একটি বড় দল, এখানে অনেক ত্যাগী ও যোগ্য নেতা রয়েছেন। দেশ ও রাজনীতির স্বার্থে অনেক সময় ব্যক্তিগত প্রত্যাশা ছাড় দিতে হয়। সবাই সেটা মেনে নিতে পারেননি। তবে জোট শরিকদের বিজয়ী করতে বিএনপি সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে।
দলীয় সূত্র জানায়, এবারের নির্বাচনে সারাদেশে বিএনপির ২৯২ জন প্রার্থী ধানের শীষ প্রতীকে লড়ছেন। বাকি আটটি আসনে মিত্র দলগুলো নিজ নিজ প্রতীকে নির্বাচন করছে। এর মধ্যে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম চারটি, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি একটি, গণসংহতি আন্দোলন একটি, গণঅধিকার পরিষদ একটি এবং বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপি একটি আসনে প্রার্থী দিয়েছে।
ঢাকা-১২ আসনে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক কোদাল প্রতীকে নির্বাচন করছেন। কিন্তু এখানে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে সাইফুল আলম নীরব ফুটবল প্রতীকে মাঠে রয়েছেন। তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হলেও এ আসনে বিএনপির নেতাকর্মীরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন, যা ভোটের লড়াইকে করেছে হাড্ডাহাড্ডি।
পটুয়াখালী-৩ আসনে গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর ট্রাক প্রতীকে নির্বাচন করছেন। এ আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী হাসান মামুন স্বতন্ত্র হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। স্থানীয় বিএনপির বড় অংশ তার পক্ষে অবস্থান নেয়ায় ভিপি নুরের জন্য লড়াই কঠিন হয়ে উঠেছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনে গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি জোট প্রার্থী হলেও বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা সাইদুজ্জামান কামাল স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে আছেন। যদিও কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপে আগের দুই বিদ্রোহী প্রার্থী সরে দাঁড়ানোয় এখানে তুলনামূলকভাবে সাকির অবস্থান কিছুটা শক্ত হয়েছে।
জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের জন্য ছেড়ে দেয়া চারটি আসনের বেশির ভাগেই একই চিত্র। সিলেট-৫, নীলফামারী-১, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ ও নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় জমিয়তের প্রার্থীরা বিএনপির ভোটব্যাংক পুরোপুরি পাচ্ছেন না। বিশেষ করে নীলফামারী-১ আসনে দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির তৃণমূল যাকে ঘিরে সংগঠিত ছিলো, হঠাৎ করে তাকে বাদ দেয়ায় স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে, দল ভেঙে বিএনপিতে যোগ দিয়ে ধানের শীষ পাওয়া প্রার্থীদের অবস্থাও নড়বড়ে। নড়াইল-২, ঝিনাইদহ-৪, কিশোরগঞ্জ-৫ ও ঢাকা-১৩ আসনে বিএনপির বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কারণে তারা তৃণমূল সমর্থন পুরোপুরি নিশ্চিত করতে পারছেন না। ব্যতিক্রম লক্ষ্মীপুর-১ আসন, যেখানে বিএনপিতে যোগ দেয়া শাহাদাত হোসেন সেলিমের পক্ষে দলীয় ঐক্য দৃশ্যমান।
এদিকে নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না আসন সমঝোতা না হওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে নিজ দলের প্রতীকে ঢাকা-১৮ ও বগুড়া-২ আসনে নির্বাচন করছেন। যদিও বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন নেতা বলছেন, এখনও সমঝোতার সম্ভাবনা পুরোপুরি শেষ হয়নি।
সব মিলিয়ে, যুগপৎ আন্দোলনের রাজনৈতিক ঐক্য ভোটের মাঠে এসে বাস্তবতায় বড় ধরনের টানাপোড়েনের মুখে পড়েছে। বিদ্রোহী প্রার্থী ও তৃণমূলের অসন্তোষ মিত্র দলগুলোর জন্য বিএনপির সঙ্গে নির্বাচনি জোটকে অনেক ক্ষেত্রে পরিণত করেছে এক কঠিন পরীক্ষায়।
সবার দেশ/কেএম




























