কর সংস্কার ও কর্মসংস্থানে বড় পরিকল্পনা
সাড়ে ৮ লাখ কোটি টাকার ছায়া বাজেট ঘোষণা এনসিপির
বর্তমান অর্থনৈতিক নীতি ও আসন্ন বাজেট কাঠামোর কঠোর সমালোচনা করে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৮ লাখ ৫২ হাজার ১৫৭ কোটি টাকার একটি ‘ছায়া বাজেট’ ঘোষণা করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
‘বাংলাদেশ ২.০: সংস্কার, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের মাধ্যমে টেকসই প্রবৃদ্ধি’ শীর্ষক প্রতিপাদ্য সামনে রেখে দলটি ১২টি খাতে মোট ৭১টি নীতিগত প্রস্তাব উপস্থাপন করেছে। একই সঙ্গে ব্যাংক খাত, রাজস্ব ব্যবস্থা এবং গভর্নর নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।
শুক্রবার (৫ জুন) রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপির দলীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ ছায়া বাজেট উপস্থাপন করা হয়। এতে মূল প্রস্তাবগুলো তুলে ধরেন দলের ছায়া বাজেট কমিটির প্রধান ও সংসদ সদস্য আতিক মুজাহিদ।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, প্রস্তাবিত বাজেটে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা। এডিপি ব্যয় ধরা হয়েছে ২ লাখ ৫২ হাজার ৬৬৭ কোটি টাকা এবং পরিচালনসহ মোট ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ৮ লাখ ৫২ হাজার ১৫৭ কোটি টাকা। ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ১২ হাজার ১৫৭ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩ দশমিক ০৯ শতাংশের মধ্যে সীমিত রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এনসিপির প্রস্তাবে কর-জিডিপি অনুপাত আগামী চার বছরে ১৩ দশমিক ১ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে এ অনুপাত ৬ দশমিক ৭ শতাংশ। এজন্য করজাল সম্প্রসারণ, ডিজিটাল তথ্য একীভূতকরণ এবং কর শনাক্তকরণ ব্যবস্থায় বড় সংস্কারের কথা বলা হয়েছে।
প্রস্তাবে টিআইএন, জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের তথ্য একীভূত করার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ ব্যবহারকে করদাতা শনাক্তকরণের সূচক হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনাও তুলে ধরা হয়।
এনসিপির হিসাব অনুযায়ী, দেশে কর্মক্ষম জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় ৬ কোটি ৯২ লাখ মানুষ থাকলেও মাত্র ৪৪ লাখ মানুষ রিটার্ন দাখিল করেন। নতুন ৮০ লাখ রিটার্ন দাখিলকারী যুক্ত করা গেলে রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলে দাবি করা হয়।
সম্পদের ওপর প্রগতিশীল কর কাঠামোর প্রস্তাবও দেয়া হয়েছে। ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত সম্পদ করমুক্ত রেখে ধাপে ধাপে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ কর আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা থেকে বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব অর্জনের সম্ভাবনার কথা জানায় দলটি।
আয়করে সংস্কারের অংশ হিসেবে সাড়ে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করমুক্ত করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। পরবর্তী ধাপে ধাপে করহার পুনর্বিন্যাসের কথাও উল্লেখ করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, বর্তমান অর্থনীতি লুটপাটনির্ভর কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তিনি ব্যাংক খাতের অনিয়ম, ক্যাপাসিটি চার্জ নির্ভরতা এবং আর্থিক খাতের অস্বচ্ছতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
ছায়া বাজেটে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে—প্রায় ১ লাখ ২৪ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা। এ খাতে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে খাদ্য কর্মসূচি সম্প্রসারণ, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের প্রস্তাব রয়েছে।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে পাঁচ বছরে এক কোটি নতুন চাকরি সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণ সুবিধা ও যুব উদ্যোক্তা তহবিল গঠনের কথা বলা হয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতে ৫২ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে জাতীয় স্বাস্থ্য বীমা চালু, সুপার-স্পেশালিটি হাসপাতাল স্থাপন ও আধুনিক অ্যাম্বুলেন্স সেবার পরিকল্পনা রয়েছে।
কৃষি, জ্বালানি ও পরিবেশ খাতেও বড় ধরনের সংস্কার প্রস্তাব এসেছে। সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণ, ডিজেলচালিত সেচপাম্প ধাপে ধাপে বন্ধ এবং নবায়নযোগ্য শক্তিতে কর সুবিধার কথা বলা হয়েছে।
আর্থিক খাতে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা, ‘ব্যাড ব্যাংক’ গঠন এবং পুঁজিবাজার সম্প্রসারণের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
এনসিপি নেতারা বলেন, এ ছায়া বাজেট কোনও কাগুজে হিসাব নয়, বরং একটি বিকল্প অর্থনৈতিক রূপরেখা, যা বাস্তবায়িত হলে রাজস্ব বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
সবার দেশ/কেএম




























