আরব নিউজের প্রতিবেদন
আমাদের জীবন নরকে পরিণত হয়েছে: আসামে বাংলাভাষী মুসলিম
ভারতের আসামসহ বিভিন্ন রাজ্যে অভিবাসনবিরোধী অভিযানের মধ্যে আটকের ভয় আর নির্বাসনের আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন বাংলাভাষী মুসলিমরা। দিল্লি ‘অবৈধ অভিবাসন’ বন্ধের নামে ব্যাপক ধরপাকড় শুরু করেছে, যার লক্ষ্য হয়ে উঠেছে বহু বছর ধরে ভারতে বসবাসরত মুসলমানরাও।
আমি বিদেশি নই, আমি সরকারি শিক্ষক ছিলাম
খাইরুল ইসলাম, আসামের প্রাক্তন স্কুলশিক্ষক, যাকে ২৪ মে তার বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে কোনওে শুনানি ছাড়াই বাংলাদেশ সীমান্তে ফেলে দেয়া হয়। তিনি বলেন,
আমার দাদা ভারতের নাগরিক ছিলেন। বাবার বন্দুকের লাইসেন্স আছে। আমি সরকারি চাকরিতে ছিলাম। তবু আমাকে জোর করে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়া হলো।
সীমান্তরক্ষীরা তার ওপর রাবার বুলেট ছুড়েছে যখন তিনি ভারতে ফিরতে চেয়েছেন।
পরিবারের লাগাতার আবেদন আর নাগরিকত্বের প্রমাণ জমা দেয়ার পর তিনি ভারতে ফিরে যেতে পেরেছেন, তবে তার অভিজ্ঞতা বহু বাঙালি মুসলিমের বাস্তবচিত্র। ‘আমার অপরাধ কী? আমি মুসলমান এবং আমি বাঙালি।’
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তথ্য: প্রক্রিয়াহীন নির্বাসন
জুলাইয়ে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানায়, মে থেকে জুনের মধ্যে অন্তত ১,৫০০ মুসলিম — যাদের অনেকে নারী ও শিশু — কোনো আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। এদের অনেকে প্রকৃত ভারতীয় নাগরিক।
এ দমন শুরু হয় জম্মু-কাশ্মীর হামলার পর
এপ্রিলের কাশ্মীর হামলার পর পাকিস্তানকে দায়ী করে বিজেপি। এরপরই বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোতে শুরু হয় ‘অবৈধ অভিবাসী’ ও ‘নিরাপত্তা হুমকি’ হিসেবে বাংলাভাষী মুসলিমদের ধরপাকড়।
আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা স্পষ্ট বলেন,
বাংলাদেশ থেকে মুসলিম অনুপ্রবেশ ভারতের পরিচয়ের জন্য হুমকি।
তিনি অভিযোগ করেন, মুসলিমদের কারণে আসামের বহু জেলায় হিন্দুরা সংখ্যালঘু হয়ে যাচ্ছে।
সরকারি জমি দখলের অভিযোগে উচ্ছেদ, কিন্তু আমরা এখানে জন্মেছি
গোলাঘাট জেলার বাসিন্দা শাজি আলী বলেন, আমার বাবা ৪০ বছর আগে এসেছিলেন। সরকারই আমাদের এখানে বসাতে সাহায্য করেছিলো। আমি এখানে জন্মেছি। এখন আমরা হঠাৎ দখলদার হয়ে গেলাম? তার প্রশ্ন — আমাদের বিরুদ্ধে এই বিদ্বেষ কেনো?
এটি নির্বাচনী রাজনীতি
অল আসাম মাইনরিটি স্টুডেন্টস ইউনিয়নের সেক্রেটারি মিন্নাতুল ইসলাম বলেন,
এটি একটি নির্বাচনী পদক্ষেপ। ২০২৬ সালের ভোটকে সামনে রেখে বাঙালি মুসলিমদের টার্গেট করা হচ্ছে। তিনি বলেন, আসামে বাস্তবে কোনো বাংলাদেশি নেই। সরকার শুধু রাজনৈতিক স্বার্থে এ দমন চালাচ্ছে।
ভারতে প্রায় ১০ কোটি বাংলাভাষী
ভারতে বাংলাভাষীরা কেবল পশ্চিমবঙ্গেই নয়, বিপুল সংখ্যায় বাস করেন আসাম, ত্রিপুরা ও অন্যান্য রাজ্যে। এর মধ্যে আনুমানিক ৩৫ মিলিয়ন মুসলমান। অথচ ভাষা ও ধর্মের মিল থাকায় তাদের বিরুদ্ধে সহজেই ‘বাংলাদেশি’ তকমা লাগিয়ে হয়রানি চালানো সম্ভব হয়ে উঠেছে।
মানবাধিকার লঙ্ঘনের আশঙ্কা
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে এই ধরপাকড় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতিমালার লঙ্ঘন। যথাযথ প্রক্রিয়া ছাড়া নির্বাসন, এলোমেলোভাবে আটক ও সরকারি সেবা থেকে বঞ্চিত করা — সবকিছুই ভারতকে একটি বৈষম্যমূলক রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থাপন করছে।
সংক্ষেপে: কী ঘটছে আসামে?
- ভারতীয় নাগরিক হয়েও বহু মুসলমানকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে
- আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া নির্বাসন, রাবার বুলেট, ধরপাকড়
- সরকারি জমিতে বসবাসের অভিযোগে উচ্ছেদ
- বাংলাভাষী মুসলমানদের ‘নিরাপত্তা হুমকি’ আখ্যা
- রাজনীতিকদের মতে, এটি নির্বাচনী এজেন্ডার অংশ
এ বাস্তবতা কেবল ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নয়, দক্ষিণ এশিয়ায় জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ভবিষ্যত নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে।
সবার দেশ/কেএম




























