সিএসওএইচ প্রতিবেদনে চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ
ভারতে মুসলিমবিদ্বেষ ছড়াতে নতুন অস্ত্র এআই!
ভারতে ইসলাম ও মুসলিমবিদ্বেষ নতুন কোনো বিষয় নয়। কিন্তু প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে এখন সেই বিদ্বেষ আরও কৌশলী, আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। এবার ঘৃণার এ আগুন ছড়াতে ব্যবহার করা হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেট (সিএসওএইচ)–এর এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ভারতে এখন মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণাপ্রচার চালাতে এআই–নির্ভর ছবি ও ভিডিওকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে প্রভাবশালী মহলগুলো।
হাজারো এআই–নির্মিত পোস্টে মুসলিমবিরোধী প্রচারণা
‘এআই জেনারেটেড ইমেজারি অ্যান্ড দ্য নিউ ফ্রন্টিয়ার অব ইসলামোফোবিয়া ইন ইন্ডিয়া’ শীর্ষক ৬০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে সংস্থাটি জানিয়েছে, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ভারতে মুসলিমদের লক্ষ্য করে ১ হাজার ৩২৬টি এআই–নির্ভর ঘৃণামূলক পোস্ট চিহ্নিত করা হয়েছে।
এ পোস্টগুলো ছড়িয়েছে এক্স, ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুকের ২৯৭টি পাবলিক অ্যাকাউন্ট থেকে। অধিকাংশই সংগঠিত সাম্প্রদায়িক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।
সিএসওএইচ–এর প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক রাকিব হামিদ বলেন, এ পরিসংখ্যানটি কেবল বরফের চূড়া। ভারতের ডিজিটাল জগতে মুসলিমবিদ্বেষের প্রকৃত পরিধি এর চেয়েও বহুগুণ বিশাল।
২০২৪ সালে হঠাৎ বাড়ে ঘৃণামূলক কার্যক্রম
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৩ সালে এ ধরনের কার্যক্রম তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে হঠাৎই ব্যাপক হারে বেড়ে যায় মুসলিমবিদ্বেষী এআই কনটেন্ট তৈরির প্রবণতা।
এর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে স্ট্যাবল ডিফিউশন, মিডজার্নি ও ডল–ই–এর মতো জনপ্রিয় এআই টুল সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য সহজলভ্য হয়ে ওঠার।
মুসলিম নারীকে টার্গেট করে অবমাননাকর ছবি
গবেষণায় দেখা গেছে, এআই–নির্মিত ছবিগুলোর বড় অংশেই মুসলিম নারীকে যৌন অবমাননাকরভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। অনেক পোস্টে ইসলামকে সহিংসতার সঙ্গে যুক্ত করে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়ানো হচ্ছে।
সিএসওএইচ–এর ভাষায়,এআই এখন সংখ্যালঘুবিরোধী প্রোপাগান্ডার নতুন সীমান্ত খুলে দিয়েছে। এটি মুসলিমদের মানবিকতাহীনভাবে উপস্থাপন, ঘৃণা ছড়ানো এবং সহিংসতাকে নান্দনিক রূপে সাজানোর কাজ করছে।
‘আই লাভ মুহাম্মদ’ আন্দোলনের সময় চরমে উত্তেজনা
প্রতিবেদন প্রকাশের সময় ভারতের উত্তরাঞ্চলে ‘আই লাভ মুহাম্মদ’ আন্দোলন চলছিলো। কানপুর থেকে শুরু হওয়া এ শান্তিপূর্ণ ধর্মীয় সমাবেশ ডানপন্থী হিন্দু সংগঠনগুলোর বিরোধিতার মুখে পড়ে সাম্প্রদায়িক রূপ নেয়।
বিভিন্ন রাজ্যে পুলিশ হাজার হাজার মুসলিমের বিরুদ্ধে মামলা করে, যদিও আয়োজকদের দাবি ছিলো—এগুলো ছিল শান্তিপূর্ণ ধর্মীয় উদ্যোগ। এ পরিস্থিতিকেই ব্যবহার করে ঘৃণাপ্রচারকারীরা এআই–নির্মিত ছবি ও ভিডিওর মাধ্যমে সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচারণা চালায়।
‘যেকোনো সংঘাতকে বানানো হচ্ছে সাম্প্রদায়িক’
প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে যেকোনও সাধারণ ঘটনা বা প্রতিবাদকেও ইচ্ছাকৃতভাবে সাম্প্রদায়িক রূপ দেয়া হচ্ছে। এআই–নির্মিত ছবি ও ভিডিও এ প্রচারণাকে আরও উসকে দিচ্ছে, দ্রুত ছড়িয়ে দিচ্ছে ঘৃণার বার্তা।
নয় দফা সুপারিশ
সিএসওএইচ প্রতিবেদনের শেষে নয়টি সুপারিশ দেয়া হয়েছে—
- এআই মডেল নির্মাতাদের জন্য শক্তিশালী কনটেন্ট শনাক্তকরণ ব্যবস্থা চালু করা।
- সরকারকে ঘৃণাপ্রচারবিরোধী সাইবার আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
- সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোতে তাৎক্ষণিক রিপোর্টিং ও টেকডাউন সিস্টেম তৈরি করা।
- এআই কনটেন্টের উৎস চিহ্নিত করতে ট্র্যাকিং মেকানিজম চালু করা।
গবেষকরা সতর্ক করেছেন, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এআই–নির্ভর ঘৃণাপ্রচার ভারতের সামাজিক কাঠামো ও ধর্মীয় সম্প্রীতিকে গভীর সংকটে ফেলবে।
সবার দেশ/কেএম




























