হাসিনা-পরবর্তী প্রথম ঈদুল আজহায় আনন্দে বাংলাদেশ
স্বস্তির ঈদযাত্রা, স্বস্তির কোরবানি
স্বৈরাচারী শাসনের পতনের পর এ প্রথমবারের মতো ঈদুল আজহা উদযাপন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। স্বাভাবিক রাজনৈতিক আবহে, নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে এবার রাজধানী ও দেশের আনাচে-কানাচে কোরবানির প্রস্তুতিতে দেখা যাচ্ছে স্বস্তির ছাপ। মানুষের মুখে হাসি, যানবাহনে ভোগান্তিহীন যাত্রা, বাজারে পর্যাপ্ত কোরবানির পশু এবং মূল্যও সাধারণের নাগালের মধ্যে—সবমিলিয়ে এবারের ঈদ হচ্ছে গত দেড় দশকে সবচেয়ে নির্ভার ও মানুষের ঈদ।
ট্রেন-বাসে স্বস্তির যাত্রা, লঞ্চে যাত্রী কম
ঢাকা থেকে ট্রেন ও বাসে স্বস্তির ঈদযাত্রা শুরু হয়েছে গত সপ্তাহ থেকেই। আগাম টিকিট কেটে যাত্রীরা নির্বিঘ্নে স্টেশন ও টার্মিনালে এসে নিজ নিজ গন্তব্যের উদ্দেশে যাত্রা করছেন। কমলাপুর রেলস্টেশনে দেখা গেছে, সময়মতো ট্রেন ছাড়ছে, যাত্রীরা আসনে বসেই যাত্রা করছেন। অতিরিক্ত চেকিং, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং হকার ও ভবঘুরেদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করায় স্টেশনজুড়ে একটা পরিপাটি পরিবেশ বিরাজ করছে।
বাসযাত্রাতেও রয়েছে শৃঙ্খলা। গাবতলী, সায়েদাবাদ ও মহাখালী বাস টার্মিনালে যাত্রীচাপ থাকলেও বিশৃঙ্খলা নেই। তবে কিছু পরিবহন নির্ধারিত সময় মেনে চলতে না পারায় যাত্রীদের কিছুটা দেরি হচ্ছে। যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিটি দূরপাল্লার বাসে সিসিটিভি বসানোর নির্দেশ দিয়েছে বাস মালিক সমিতি। এ বিষয়ে বাস মালিক নেতাদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি জরুরি বৈঠকও হয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম জানিয়েছেন, এবার যাত্রীদের ছবি তুলে রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে যাতে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা না ঘটে। এ ছাড়াও র্যাব-পুলিশ, বিআরটিএ, ভোক্তা অধিকার ও সেনা টহল টিম নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছে।

অন্যদিকে, সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে যাত্রী চাপ আগের মতো নেই। আগাম টিকিট বিক্রিতে সাড়া না থাকায় অনেক কেবিন খালি। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর দক্ষিণাঞ্চলের যাত্রীদের লঞ্চ নির্ভরতা অনেকটাই কমে গেছে।
পশুর হাটে স্বস্তি, দামে স্বস্তি
রাজধানীজুড়ে কোরবানির হাটে উঠেছে বিপুল সংখ্যক পশু। শনিরআখড়া, গাবতলী, কামরাঙ্গীরচরসহ বড় হাটগুলো ছাড়াও পাড়া-মহল্লার অলিগলিতেও পশু বাঁধা দেখা যাচ্ছে। হাট ঘুরে দেখা গেছে, এবারে গরুর দাম তুলনামূলক কম, বিক্রেতারাও বিক্রি নিয়ে চিন্তায় রয়েছেন।
বিক্রেতাদের ধারণা, আওয়ামী আমলের চাঁদাবাজ, টেন্ডারবাজ, ঘুষখোর রাজনীতিবিদ ও তাদের অনুসারীরা পলাতক থাকায় বড় অঙ্কের পশু কেনার ক্রেতা অনেক কমে গেছে। একসময় ছাত্রলীগের ক্যাডার থেকে শুরু করে এমপি-মন্ত্রী পর্যন্ত একাধিক গরু কোরবানি দিতেন, এবার তাদের অনুপস্থিতি হাটে বেশ দৃশ্যমান। ফলে পশুর চাহিদা কিছুটা কম, দামও পড়ে গেছে।
এছাড়া সরকারি মনিটরিং, চাঁদাবাজমুক্ত হাট, ইজারাদারদের শৃঙ্খলা রক্ষা ও স্বেচ্ছাসেবকদের সহযোগিতায় হাটে শৃঙ্খলা বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে বলে জানিয়েছেন হাট সংশ্লিষ্টরা।
যাত্রা নির্বিঘ্ন রাখতে মালিক-শ্রমিক-প্রশাসনের ত্রিমুখী তৎপরতা
ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম জানিয়েছেন, যাত্রী হয়রানি ঠেকাতে সব বাসে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে গাবতলী টার্মিনালে কিছু অনিয়ম ধরা পড়ায় জরিমানা করা হয়েছে এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, আমরা মালিকদের নির্দেশ দিয়েছি যেন নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে এক টাকাও বেশি না নেয়া হয়।
‘ঈদ স্পেশাল সার্ভিস’ চালু করেছে বিআরটিসি। ৬৫০টি বাস প্রস্তুত রাখা হয়েছে এ বিশেষ সেবার জন্য। চলবে ১৪ জুন পর্যন্ত। আশা করা হচ্ছে, স্বল্প সময়ের মধ্যেই কোটি মানুষ নিরাপদে নিজ গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে।
ঈদের ছুটি দীর্ঘ, যাত্রীর ঢল
যাত্রী কল্যাণ সমিতি জানিয়েছে, এবারের ঈদে টানা ১০ দিনের ছুটি থাকায় ঢাকাসহ আশপাশের এলাকা থেকে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ মানুষ গ্রামে ফিরবে। ফলে বাস-ট্রেন টার্মিনাল এবং মহাসড়কে চাপ থাকলেও যানজট তেমন দেখা যাচ্ছে না। বিশেষ করে ঢাকা-টাঙ্গাইল ও সিরাজগঞ্জ মহাসড়কে সম্প্রসারিত ৬ লেন ও ৪ লেন খুলে দেওয়ায় যানজট নেই বললেই চলে।
চাপ কম লঞ্চে, নিষেধ ট্রাকে যাত্রী তোলা
বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতির সভাপতি তোফাজ্জল হোসেন মজুমদার অনুরোধ করেছেন, কেউ যেন ট্রাকে যাত্রী না তোলেন। প্রতি ঈদেই এ নিয়ে দুর্ঘটনা ঘটে। অন্যদিকে, পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণাঞ্চলে লঞ্চযাত্রী কমেছে। এবারও লঞ্চে যাত্রী কম থাকায় কিছু লঞ্চ চলাচল বন্ধ রেখেছে কর্তৃপক্ষ।
সত্যিই কি এবারের ঈদ স্বস্তির?
রাজনৈতিক শৃঙ্খলাপরায়ণতা, দুর্নীতিবাজদের অনুপস্থিতি, সরকারি মনিটরিং, যানজটহীন রাস্তা, সাশ্রয়ী পশু, নিরাপদ যাত্রা—সবকিছু মিলিয়ে সাধারণ মানুষের মুখে এ প্রশ্নই ঘুরছে: এটাই কি আমাদের হারিয়ে যাওয়া স্বাভাবিক ঈদ?
বহুজন বলছেন, এটি গত ১৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক ঈদ যাত্রা। মানুষ ফিরছে আপন ঘরে, ঈদের আনন্দ ভাগ করে নিতে—নির্ভার, নির্বিঘ্ন এবং সবচেয়ে বড় কথা—নিরাপদে।
সবার দেশ/কেএম




























