শাহজালাল বিমানবন্দরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড
কার্গো ভিলেজ পুড়ে ছাই, বিলিয়ন ডলার ক্ষতি
শিল্পের কাঁচামাল পুড়ে বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির শঙ্কা। রাত ৯টা থেকে ফ্লাইট পুনরায় চালু। ফায়ার সার্ভিসের ৩৭ ইউনিট, সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর চেষ্টায় ৭ ঘণ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে। ঢাকাগামী ফ্লাইট নেমেছে চট্টগ্রাম, সিলেট ও কলকাতায়। কুরিয়ার শাখা থেকে সূত্রপাত।
ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে কোটি কোটি টাকার শিল্পের মূল্যবান কাঁচামাল ও জরুরি নথিপত্র। শনিবার (১৮ অক্টোবর) দুপুর সোয়া ২টার দিকে বিমানবন্দরের ৮ নম্বর গেটসংলগ্ন কার্গো এলাকায় আগুন লাগে, যা নিয়ন্ত্রণে আনতে ফায়ার সার্ভিস, সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনীর সদস্যদের টানা সাত ঘণ্টার লড়াই করতে হয়।
সাত ঘণ্টার লড়াই, ব্যর্থতার প্রশ্ন
ফায়ার সার্ভিসের ১৩টি স্টেশনের ৩৭টি ইউনিট, রোবটসহ আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করেও রাত ৯টার আগে আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি। অথচ নিয়মিত অগ্নিনিরাপত্তা মহড়ায় দাবি করা হয়, শাহজালাল বিমানবন্দরের জরুরি প্রস্তুতি ‘আন্তর্জাতিক মানের’। বিশ্লেষকদের মতে, এ বাস্তব আগুন সে কাগুজে সক্ষমতার কার্যকারিতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে।
ফায়ার সার্ভিসের মিডিয়া অফিসার তালহা বিন জসিম জানান,
দুপুর সোয়া ২টার দিকে খবর পেয়ে ২টা ৫০ মিনিটে প্রথম ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায়। আগুনের তীব্রতা এতোটাই বেশি ছিলো যে এক অংশ নেভাতে না নেভাতেই অন্য অংশে জ্বলে উঠছিলো।

সামরিক বাহিনীর যৌথ অভিযান
আইএসপিআর জানিয়েছে, ফায়ার সার্ভিসের পাশাপাশি সেনা, বিমান ও নৌবাহিনীর সদস্যরা অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধার অভিযানে অংশ নেন। বিমানবন্দরের নিজস্ব ফায়ার ইউনিটও প্রথম থেকেই কাজ শুরু করে। উদ্ধার অভিযানে যোগ দেয় দুই প্লাটুন বিজিবিও।
বিমান চলাচল বন্ধ, অবতরণ অন্যত্র
অগ্নিকাণ্ডের পর বিকেল সাড়ে ৩টা থেকে বিমান ওঠানামা বন্ধ করে দেয়া হয়। ঢাকাগামী আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বেশ কয়েকটি ফ্লাইট পাশের বিমানবন্দরে অবতরণ করানো হয়। রাত ৯টার পর দুবাই থেকে আসা একটি ফ্লাইট অবতরণের মধ্য দিয়ে পুনরায় ফ্লাইট চলাচল শুরু হয়।
আহত ২৫ আনসার সদস্য
অগ্নিনির্বাপণ অভিযানে অংশ নেয়া অন্তত ২৫ জন আনসার সদস্যসহ ফায়ার সার্ভিসের কয়েকজন কর্মী আহত হন। তাদের সিএমএইচ ও কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
পুড়লো কাঁচামাল, ধ্বংস হলো ব্যবসায়ীদের আশা
কার্গো ভিলেজে আমদানি করা শিল্পের কাঁচামাল, পোশাক, ওষুধ ও রাসায়নিক দ্রব্য মজুদ ছিলো। ব্যবসায়ীদের দাবি, বিলিয়ন ডলারের বেশি ক্ষতি হয়েছে। বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, কমপক্ষে ২৫০টি কারখানার পণ্য এ আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আমাদের জন্য এটি এক ভয়াবহ ধাক্কা।
আইএইএবি সভাপতি কবীর আহমেদ বলেন, এ আগুন শুধু কুরিয়ার বা স্টোর পুড়ায়নি, বরং বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার নগ্ন দুর্বলতা প্রকাশ করেছে। কেপিআইভুক্ত এলাকায় এমন ঘটনা অগ্রহণযোগ্য।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা
এক প্রত্যক্ষদর্শী ফারুক হোসেন জানান,
দুপুর ১টা ৫০ মিনিটের দিকে একটি এসির পাশে আগুন দেখি। দ্রুত কেমিক্যাল ভর্তি ড্রামগুলো বিস্ফোরিত হতে শুরু করে, ভয়ঙ্কর শব্দ হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, আগুনের সূত্রপাত হয় কুরিয়ার গুদাম এলাকা থেকে, যেখানে বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক পদার্থ মজুদ ছিলো।
তদন্ত কমিটি ও নাশকতার আশঙ্কা
ঘটনার পর বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ সাত সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। এনবিআর ও অর্থ মন্ত্রণালয়ও আলাদা করে পাঁচ সদস্যের দুটি কমিটি করেছে। প্রাথমিকভাবে নাশকতা বা অবহেলার দিকগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে,
যদি নাশকতার প্রমাণ পাওয়া যায়, সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।
বাতাসের বাধা, ফায়ার সার্ভিসের চ্যালেঞ্জ
রাত ১০টার দিকে ব্রিফিংয়ে ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল বলেন, বাতাসের চাপের কারণে আগুন নেভানো ছিলো বড় চ্যালেঞ্জ। তীব্র তাপ আর বাতাসের দিক পাল্টে যাওয়ায় আগুন ছড়িয়ে পড়ে। তাই সময় লেগেছে সাত ঘণ্টা।
‘মহড়ার বাস্তবতা ভিন্ন ছিলো’
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন,
প্রতি দুই বছর পরপর মহড়া হয়—কাগজে সেটা সফল বলা হলেও এ বাস্তব আগুন প্রমাণ করেছে, সে সক্ষমতা অনেকটাই ভান। এটি শুধু কোটি টাকার ক্ষতি নয়, বরং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার বড়সড় সতর্কবার্তা।
সারসংক্ষেপ
এ অগ্নিকাণ্ডে কেউ প্রাণ হারায়নি—তবে পুড়ে গেছে ব্যবসার আস্থা, নিরাপত্তা ব্যবস্থার মর্যাদা এবং কর্তৃপক্ষের তথাকথিত প্রস্তুতির মুখোশ। কার্গো ভিলেজের এ আগুন এখন শাহজালাল বিমানবন্দরের অগ্নিনিরাপত্তা ও সমন্বয় ব্যবস্থার সামনে এক জ্বলন্ত প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সবার দেশ/কেএম




























