ঘুষ-দুর্নীতি, হাউজিং সিন্ডিকেট আর নির্যাতনের কাহিনি
দুদকের জালে অতিরিক্ত ডিআইজি গাজী মোজাম্মেল দম্পতি
রাষ্ট্রের দায়িত্বে থেকে ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিলাসী জীবনযাপন—এ যেন চিত্রনাট্যের গল্প। অথচ বাস্তবের ঘটনা অতীতের যেকোনও কেলেঙ্কারিকে হার মানাচ্ছে। ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগে এন্টি টেররিজম ইউনিটের অতিরিক্ত ডিআইজি গাজী মো. মোজাম্মেল হক এবং তার স্ত্রী ফারজানা মোজাম্মেলের বিরুদ্ধে প্রাথমিক অনুসন্ধানে চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) জানিয়েছে, এন্টি টেররিজম ইউনিটের অতিরিক্ত ডিআইজি গাজী মো. মোজাম্মেল হক এবং তার স্ত্রী ফারজানা মোজাম্মেলের নামে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত বিপুল সম্পদের প্রমাণ মিলেছে। শুধু তাই নয়, জমি দখল, হাউজিং সিন্ডিকেট এবং রিমান্ডের নামে ভয়ঙ্কর নির্যাতনের অভিযোগে ইতোমধ্যেই তোলপাড় শুরু হয়েছে প্রশাসনিক মহলে।
দুদকের অনুসন্ধান বলছে, মোজাম্মেলের নামে বৈধ আয়ের তুলনায় ১১ কোটি ৬৮ লাখ টাকার বেশি অবৈধ সম্পদ রয়েছে। স্ত্রী ফারজানার নামে রয়েছে আরও ৩ কোটি টাকার বেশি অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পদ। রোববার (৩১ আগষ্ট)দুদক তাদের উভয়কে সম্পদ বিবরণীর নোটিশ পাঠিয়েছে। দুদকের মহাপরিচালক আক্তার হোসেন সাংবাদিকদের এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
রূপগঞ্জে পুলিশ হাউজিং সোসাইটি ও জমি দখলের চিত্র
মোজাম্মেলের বিরুদ্ধে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অভিযোগ রূপগঞ্জে গড়ে ওঠা ‘আনন্দ পুলিশ হাউজিং সোসাইটি’কে ঘিরে। তিন হাজার বিঘারও বেশি জমি দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে এ প্রকল্প। সরেজমিনে অভিযোগ উঠেছে, ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে বাজারমূল্যের তুলনায় নামমাত্র দামে জমি হাতিয়ে নেয়া হয়েছে। অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন, শুধু জমি দখলই নয়—রিমান্ডের ভয় দেখিয়ে, এমনকি ডিবি অফিসে আটকে রেখে ভয়ঙ্কর নির্যাতনের মাধ্যমে জমি লিখে নেয়া হয়েছে।
২০১৯ সালের আলোচিত একটি ঘটনার উদাহরণ দিচ্ছে সব কিছু। রূপগঞ্জের সত্তরোর্ধ্ব জাহের আলীকে ১৩ দিন ডিবি অফিসে আটকে রেখে অকথ্য নির্যাতন চালানো হয়। অভিযোগ, শেষ পর্যন্ত নিজের ৬২ বিঘা জমি গাজী মোজাম্মেলের নামে লিখে দিতেই বাধ্য হন তিনি। এ ঘটনায় মামলা হলেও ভুক্তভোগীরা জমি ফেরত পাননি। স্থানীয় সূত্র জানায়, পুরো প্রক্রিয়ায় মোজাম্মেলকে সহায়তা করেছে প্রভাবশালী স্থানীয় একটি চক্র।
মেঘনায় বিলাসী সাম্রাজ্য—রিসোর্ট, অট্টালিকা, বাগানবাড়ি
মোজাম্মেলের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার মেঘনা উপজেলার হরিপুর। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে অবৈধ অর্থে গড়া এক বিলাসবহুল সাম্রাজ্য। ২০০ বিঘা জমির ওপর নির্মিত হয়েছে ‘মেঘনা রিসোর্ট’। শুধু তাই নয়, রয়েছে চারতলা অট্টালিকা, বিশাল বাগানবাড়ি এবং মৎস্য খামার। স্ত্রী ফারজানা মোজাম্মেলের নামে গড়ে ওঠা এসব সম্পদের বিষয়ে দুদক বলছে, বৈধ আয়ের উৎস দেখাতে ব্যর্থ হলে শিগগিরই কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।
দুদকের হিসাব যা বলছে
দুদকের তদন্ত বলছে, চাকরি জীবনে মোজাম্মেলের বৈধ আয় প্রায় ১৫ কোটি ৮০ লাখ টাকা। অথচ তার সম্পদ ও ব্যয় মিলিয়ে পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা। অন্যদিকে স্ত্রী ফারজানা মোজাম্মেলের বৈধ আয় যেখানে ৫ কোটি ৪৫ লাখ টাকা, সেখানে তার সম্পদ-ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৮ কোটি ৩১ লাখ টাকা।
ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন
একজন অতিরিক্ত ডিআইজি কীভাবে এত অঢেল সম্পদের মালিক হলেন? প্রশ্নটা শুধু সাধারণ মানুষের নয়, প্রশাসনিক মহলেও আলোচিত। অভিযোগ রয়েছে, রূপগঞ্জে জমি দখলের ঘটনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যন্ত অবগত ছিলেন। এমনকি ভুক্তভোগীরা বারবার ন্যায়বিচারের দাবি করলেও শেষ পর্যন্ত কিছুই হয়নি।
দুদকের পরবর্তী পদক্ষেপ
দুদক বলছে, মোজাম্মেল দম্পতির সম্পদ বিবরণী চাওয়া হয়েছে। তদন্তে জালিয়াতি বা অবৈধ অর্থের প্রমাণ মিললে আইনের সর্বোচ্চ শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। এসব অভিযোগের বিষয়ে অধিকতর অনুসন্ধান চলছে। মোজাম্মেল দম্পতির সম্পদ বিবরণী পর্যালোচনার পর পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে।
সবার দেশ/কেএম




























