বৈশ্বিক নেট থেকে স্থায়ী বিচ্ছিন্নতার শঙ্কা
জাতীয় ইন্টারনেটসহ নিজস্ব সোশ্যাল মিডিয়ার পথে ইরান
ইরান সরকার দেশটিকে স্থায়ীভাবে বৈশ্বিক ইন্টারনেট ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করার পথে এগোচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছেন দেশটির একাধিক ডিজিটাল অধিকারকর্মী। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে সাধারণ নাগরিকদের জন্য আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট কার্যত বন্ধ হয়ে যাবে এবং শুধু সরকারের অনুমোদনপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাই সীমিতভাবে বৈশ্বিক ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ পাবেন।
ইন্টারনেট সেন্সরশিপ পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ফিল্টারওয়াচের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানে ইন্টারনেট ব্যবহার আর নাগরিক অধিকার হিসেবে বিবেচিত হবে না; বরং এটি সরকারের দেয়া একটি ‘বিশেষ সুবিধা’তে পরিণত হবে।
ফিল্টারওয়াচের প্রধান আমির রাশিদি জানান, নতুন ব্যবস্থায় যাদের নিরাপত্তা ছাড়পত্র থাকবে বা যারা সরকারি যাচাই প্রক্রিয়া পাস করবেন, কেবল তারাই সীমিত ও কড়া ফিল্টার করা বৈশ্বিক ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারবেন। সাধারণ জনগণের জন্য চালু থাকবে তথাকথিত জাতীয় ইন্টারনেট, যা পুরোপুরি দেশীয় প্রযুক্তিনির্ভর এবং বৈশ্বিক ইন্টারনেট থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন।
এ জাতীয় ইন্টারনেট মূলত সরকার নিয়ন্ত্রিত একটি সমান্তরাল নেটওয়ার্ক। এখানে কেবল সরকার অনুমোদিত সার্চ ইঞ্জিন, মেসেজিং অ্যাপ এবং দেশীয় স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের সুযোগ থাকবে, যাকে অনেকেই ‘ইরানি নেটফ্লিক্স’ নামে অভিহিত করছেন।
ডিজিটাল অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, এ বিস্তৃত সেন্সরশিপ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চীন ও হুয়াওয়ের উন্নত প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়েছে। এসব প্রযুক্তির মাধ্যমে ইন্টারনেট ট্রাফিক পর্যবেক্ষণ, নিয়ন্ত্রণ ও প্রয়োজন অনুযায়ী বন্ধ করা সম্ভব।
৮ জানুয়ারি থেকে ইরানে যে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট শুরু হয়েছে, তা ইতিমধ্যে ২০১১ সালে মিসরের তাহরির স্কয়ার আন্দোলনের সময়কার ইন্টারনেট শাটডাউনের রেকর্ডও ছাড়িয়ে গেছে। নেটব্লকসের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে ২০০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে কার্যকর ইন্টারনেট সংযোগ নেই।
সরকারি মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানি ইঙ্গিত দিয়েছেন, আগামী ২০ মার্চ ইরানি নববর্ষ নওরোজ পর্যন্ত এ ব্ল্যাকআউট অব্যাহত থাকতে পারে।
ইন্টারনেট সেন্সরশিপ নিয়ে কাজ করা মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের এক সাবেক কর্মকর্তা দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, ইরান স্থায়ীভাবে বৈশ্বিক ইন্টারনেট ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারে—এটা ভীতিকর হলেও অসম্ভব নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি হঠাৎ নেওয়া কোনও সিদ্ধান্ত নয়; বরং গত ১৬ বছরের পরিকল্পনার চূড়ান্ত ধাপ। ২০০৯ সালে সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদের পুনর্নির্বাচনের পর ব্যাপক বিক্ষোভ চলাকালে ইন্টারনেট বন্ধ করে সরকার উপলব্ধি করে যে, সম্পূর্ণ ব্ল্যাকআউট অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এরপর ২০১২ সালে গঠিত হয় সুপ্রিম কাউন্সিল অব সাইবারস্পেস এবং দেশীয় ইন্টারনেট গড়ে তোলার কাজ শুরু হয়।
পরবর্তী বছরগুলোতে সরকার আরও কৌশলী হয়ে ওঠে। ২০১২ সালের বিক্ষোভের সময় ফেসবুক, টুইটার ও গুগলের মতো প্ল্যাটফর্ম বন্ধ রাখা হলেও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অনলাইন সেবাগুলো চালু রাখা হয়। গবেষকদের মতে, ইরানে চালু হওয়া এ ‘হোয়াইটলিস্টিং ব্যবস্থা’ চীনা প্রযুক্তির সহায়তায় গড়ে তোলা হয়েছে।
এ ব্যবস্থায় ব্যবহৃত হয় উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন মিডলবক্স, যা ইন্টারনেট ট্রাফিক পর্যবেক্ষণ, নিয়ন্ত্রণ ও ব্লক করতে সক্ষম। এর মাধ্যমে গোটা দেশের ইন্টারনেট কার্যক্রম নজরদারি করা, ব্যবহারকারীদের ওপর গুপ্তচরবৃত্তি চালানো এবং ভিপিএনসহ বিভিন্ন টুল বন্ধ করা সম্ভব হয়।
২০১৫ সালে কয়েকজন গবেষক বিটকয়েন ব্যবহার করে ইরানি সার্ভার কিনে পরীক্ষা চালিয়ে দেখেন, সেখানে এমন একটি অভ্যন্তরীণ ইন্টারনেট ব্যবস্থা রয়েছে, যা করপোরেট অফিস নেটওয়ার্কের মতো বাইরের বিশ্বের সঙ্গে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন।
এদিকে ইরানি কর্তৃপক্ষ যখন ‘ইন্টারনেট কিল সুইচ’ চূড়ান্তভাবে কার্যকর করার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন বিক্ষোভকারীদের জন্য ইলন মাস্কের স্টারলিংক একটি বিকল্প হিসেবে সামনে এসেছে। তবে ২০২৫ সালে পাস হওয়া নতুন আইন অনুযায়ী, ইরানে স্টারলিংক টার্মিনাল রাখা ‘ইসরায়েলের জন্য গুপ্তচরবৃত্তি’র সমান অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। পাশাপাশি তেহরানের আকাশসীমায় রুশ ও চীনা প্রযুক্তির জ্যামার ব্যবহার করে স্টারলিংক সিগন্যাল ব্যাহত করার চেষ্টাও চালাচ্ছে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী।
সবার দেশ/কেএম




























