এনসিপি ও শাপলা প্রতীক নিয়ে টানাপোড়েন
বিএনপির প্রস্তাব নাকচ: জোটের প্রতীকে ভোটের সুযোগ রাখছে না ইসি
জোটবদ্ধ দলগুলোকে একক প্রতীকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে বিএনপির প্রস্তাব নাকচ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নতুন অনুমোদিত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী—যে দল নিবন্ধিত, তাকে নিজস্ব প্রতীকেই নির্বাচনে অংশ নিতে হবে। ফলে বিএনপির প্রস্তাবিত ‘জোটের প্রতীকে ভোট’ দেয়ার পথ আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ হলো।
ইসির সূত্র জানায়, সোমবার সন্ধ্যায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসিরউদ্দীনের সভাপতিত্বে কমিশনের পাঁচ সদস্য ও সিনিয়র সচিবদের নিয়ে এক অনির্ধারিত সভা হয়। ওই বৈঠকে বিএনপির দেয়া প্রস্তাবটি ‘অগ্রহণযোগ্য’ হিসেবে চূড়ান্তভাবে নাকচ করা হয়। কমিশনের ভাষায়—আরপিও এখন উপদেষ্টা পরিষদ অনুমোদিত আইন; এ পর্যায়ে তা সংশোধনের এখতিয়ার আমাদের নেই।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন উপদেষ্টা পরিষদ আরপিও-১৯৭২ সংশোধনের চূড়ান্ত অনুমোদন দেন। অনুমোদনের পর বিএনপিসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল নতুন ধারাগুলো নিয়ে আপত্তি জানায়। বিএনপির প্রতিনিধি দল রোববার ইসিতে গিয়ে ৩৬ দফা প্রস্তাব দেয়, যার মধ্যে ২০ নম্বর ধারায় জোটের প্রতীকে নির্বাচনের সুযোগ রাখার দাবি ছিলো অন্যতম।
তবে ইসির একাধিক কমিশনার গণমাধ্যমকে জানান, আইন অনুমোদনের পর কমিশনের করণীয় সীমিত। ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, আইনটি তিন মাস মন্ত্রণালয়ে যাচাই-বাছাই হয়েছে, তখন কোনও দল আপত্তি জানায়নি। এখন কমিশনের কিছু করার নেই।
আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এক যুগ্মসচিবও মন্তব্য করেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে উপদেষ্টা পরিষদের সর্বোচ্চ তিনটি সভা হতে পারে। এর মধ্যে পুনরায় প্রস্তাব তোলা বাস্তবসম্মত নয়।
‘না ভোট’ ও সেনাবাহিনী সংজ্ঞা সংশোধনসহ ৪৮টি পরিবর্তন
সূত্র জানায়, আরপিওতে মোট ৪৮টি সংশোধনী যুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ‘না ভোট’ ফিরিয়ে আনা, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় সেনাবাহিনীর সদস্যদের সংজ্ঞা অন্তর্ভুক্ত করা এবং জোটবদ্ধ দলগুলোর নিজস্ব প্রতীকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করা—এ তিনটি পরিবর্তনকে বলা হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
এ পরিবর্তনগুলো মূলত ঐকমত্য সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী অনুমোদিত হয়। বিএনপি এ সিদ্ধান্তকে ‘রাজনৈতিকভাবে প্রণোদিত’ দাবি করে পুনর্বিবেচনার আবেদন জানালেও তা গৃহীত হয়নি।
এনসিপি ও শাপলা প্রতীক নিয়ে টানাপোড়েন
এদিকে জুলাই অভ্যুত্থানে ভূমিকা রাখা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও নির্বাচন কমিশনের মধ্যে শাপলা প্রতীক নিয়ে দ্বন্দ্ব অব্যাহত। এনসিপি হুঁশিয়ারি দিয়েছে, শাপলা প্রতীক না পেলে তারা নিবন্ধন নেবে না এবং নির্বাচনে অংশ নেবে না। ইসি বলছে, কোনও দল বা জোটের চাপে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হবে না।
রাজনৈতিক মহলে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে, বিএনপির দাবি মানলে ইসির নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারতো। এনসিপিসহ অন্য দলগুলোর চাপের মুখে পড়তে পারতো কমিশন। তাই ইসি এখন নীতিগতভাবে ‘কঠোর নিরপেক্ষ অবস্থান’ বজায় রাখছে।
বাংলাদেশ জাতীয় লীগের নিবন্ধন ঝুলে গেলো
এদিকে, ঐতিহাসিকভাবে বিলুপ্ত ‘বাংলাদেশ জাতীয় লীগ’-এর নিবন্ধন প্রক্রিয়া স্থগিত হয়ে যেতে পারে। তদন্তে দেখা গেছে, দলটির রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা ও সাংগঠনিক অস্তিত্ব নেই। দলের প্রতিষ্ঠাতা আতাউর রহমান খান ৭৩ ও ৭৮ সালের নির্বাচনে ‘লাঙ্গল’ প্রতীকে অংশ নিলেও পরে এরশাদের জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়ে ওই প্রতীকও হারান।
ইসির তদন্ত কমিটি জানিয়েছে, জাতীয় লীগের জেলা-উপজেলা পর্যায়ে কোনো সক্রিয় কমিটি নেই, রাজনৈতিক কার্যক্রমও দেখা যায়নি। ফলে কমিশনের সুপারিশ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দলটির নিবন্ধন ‘অনির্দিষ্টকালের জন্য’ স্থগিত থাকার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, নির্বাচন কমিশনের এসব সিদ্ধান্ত একদিকে আইনগত দৃঢ়তা বাড়ালেও, অন্যদিকে রাজনৈতিক মাঠে নতুন অস্থিরতা তৈরি করতে পারে—বিশেষ করে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের আগে।
সবার দেশ/কেএম




























