কৈ -এর তেলে কৈ ভাজা, জনতার হাতে গজা
এমন সচিব কোথাও তুমি পাবে নাকো খুঁজে
মাতৃভূমির ক্ষতির মাঝে যে নিজের স্বার্থ বোঝে।
ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো’তে বাংলাদেশ সরকারের তিন সচিব রয়েছেন পরিচালক পর্ষদের সদস্য হিসেবে। পর্ষদের একটি মিটিংয়ে প্রত্যেক সচিব পঞ্চাশ হাজার টাকা করে ভাতা পান, বছরে ১৩ টি মিটিং হয়, সে হিসেবে সাড়ে ৬ লক্ষ টাকা বছর প্রতি তারা প্রত্যেকে পেয়ে থাকেন।
এতো এক সোনার ডিমপাড়া হাঁস তাই না, কি বলেন আপনারা? বর্তমান শিল্প সচিব মহোদয়ও বিএটি বোর্ডের মেম্বার হিসাবে আছেন। শুধু তাই নয়, এরকম সামরিক বেসামরিক আমলাদের সন্তান এবং আত্মীয়-স্বজনরা অনেকেই বড় বড় বেতনে চাকুরী করে যাচ্ছেন এখনো বৃটিশ আমেরিকান টোব্যাকো’তে।
আপনাদের মনে হয়তো প্রশ্ন জাগছে তাতে ক্ষতি কি, এতে তো উপকারই হওয়ার কথা। বাংলাদেশের কিছু মানুষ একটি প্রতিষ্ঠিত ভালো কোম্পানিতে চাকুরী করে যাচ্ছেন, ভালো বেতন পেয়ে নিজের সংসারকে সুন্দরভাবে সামলাতে পারছেন, ভালো একটা অবস্থানে আছেন । এতে তো ব্যক্তি, সমাজ সর্বোপরি দেশের উপকার হচ্ছে। এরকম অবস্থা দেখে কাদের আবার গাত্রদাহ হচ্ছে?
ব্যক্তিগতভাবে তারা লাভবান হচ্ছেন এবং টিপটপ খুব সুন্দর ভাবে একটি এলিট জীবনযাপন করছেন, এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। গাত্রদাহ, তা তো হচ্ছেই, শুধু কোন ব্যক্তি বিশেষ বা একটি গোষ্ঠীরই গাত্রদাহ হওয়ার কথা নয়, ব্যাপারটি আপনার কাছে পরিষ্কার হওয়ার পর আপনি সহ বাংলাদেশের প্রত্যেক জনগণেরই গাত্রদাহ হওয়ারই কথা। গোমর ফাঁস হলে এ অবস্থা বন্ধ করার জন্য তখন সকলেই সচেষ্ট ভূমিকা রাখতে সোচ্চার গণ আন্দোলন গড়ে তুলবে।
আসুন ব্যাপারটি আমরা একটু বোঝার চেষ্টা করি। বাংলাদেশ তামাক উৎপাদন এবং রফতানি করে যে টাকা আয় করে, তামাক জাতীয় পণ্যের উৎপাদন করতে গিয়ে তার বিষক্রিয়া জনিত কারণে যে সকল রোগবালাই এর সৃষ্টি হয় তা সারাতে গিয়ে যে চিকিৎসা ব্যয় হয় তা তামাক জাতীয় পণ্যের উৎপাদন এবং রফতানি আয়ের চেয়ে কয়েকগুন বেশি। অর্থাৎ ব্যাপারটি এমন যে, বাংলাদেশে যদি তামাক জাতীয় পণ্য উৎপাদন না করা হতো, তাহলে ওই ধরনের পণ্য বাহিত কোন রোগ এ দেশে হতো না এবং আমাদের চিকিৎসা ক্ষেত্রেও সেজন্য কোন ব্যয় করা লাগতো না, অর্থাৎ অর্থনৈতিকভাবে দেশ লাভবান হতো।
আপনি হয়তো এখন ভাবছেন আমলা এবং সামরিক কর্মকর্তারা উপদেষ্টা বা সদস্য হিসেবে বিএটি বোর্ডে থাকলে এবং তাদের সন্তান বা আত্মীয়-স্বজনরা চাকরি করায় অর্থনীতির সাথে সম্পর্ক কি, তাইতো? আছে আছে, এটা জানার পরই তো আপনাদের গাত্রদাহ হবে কি হবে না সে ব্যাপার নিহিত রয়েছে।
আরও পড়ুন <<>> জাতীয় সরকারই কি মুক্তির উপায়!
বিএটি বোর্ড (ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বোর্ড) বা এজাতীয় কোম্পানিগুলো কেনো সামরিক, বেসামরিক আমলা এবং তাদের আত্মীয়-স্বজনকে চাকুরী দিয়ে থাকে, সেটি বুঝতে পারলেই পরিষ্কার হয়ে যাবে বিষয়টি আপনাদের কাছে। এখানেই আসল রহস্য লুকিয়ে আছে।
ওই কোম্পানিগুলো তো আপনাকে বা আমাকে বড় বড় বেতনের চাকুরীতে নিয়োজিত করে না বরং তাদের নজর থাকে ঐ সকল রুই কাতলা বা তাদের আত্মীয়দের দিকে। বোর্ড এর সদস্য হয়ে অথবা চাকুরী পাওয়ার পর কোম্পানির প্রতি তাদের একটা দায় তৈরি হয়, অর্থাৎ ‘নুন খেলে তো গুণ গাইতেই হয়’ ব্যাপারটি এমন আর কি।
একটি উদাহরণ দিচ্ছি আশা করি আপনাদের কাছে পুরো ব্যাপারটি ফকফকা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে যাবে।
তামাক জাতীয় পণ্য রফতানি করলে সরকারকে শতকরা ২৫ ভাগ আয়কর দিতে হতো। শ্রম সচিব বিএটি বোর্ডের সদস্য হওয়ায় তিনি একবার বাজেটে আয়কর কমিয়ে শতকরা ১০ ভাগ করে দেন এবং গত বাজেটে এই আয়কর শূন্যে নামিয়ে দেন, অর্থাৎ তামাক জাতীয় পণ্য রফতানির জন্য এখন আর কোন কর দিতে হয় না। যেহেতু উনি বড় অংকের একটি মাসোহারা পান বা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হয়ে থাকেন, সেহেতু নুন খাওয়ার প্রতিদান হিসেবে তিনি রাষ্ট্রের এ কল্যাণটুকু(?) করেছেন নিজের স্বার্থের বিনিময়ে। এ সমস্ত তথ্য তো আর সচরাচর প্রকাশিত হয় না। এগুলো তো অনেক বড় বড় ব্যাপার, যাদের টাকায় তাদের বেতন হয় সে আপামর জনসাধারণ তো অনেক ছোট প্রকৃতির মানুষ তারা কিভাবে জানে, এগুলো জানে শুধু রাষ্ট্রের বড় বড় মাথাওয়ালা রুই কাতলারা।
প্রিয় পাঠক, ইতিমধ্যে নিশ্চয়ই বুঝে গিয়েছেন কোথাকার পানি কোথায় গিয়ে গড়ায়।
লেখক:
এম এম এ শাহজাহান, প্রকৌশলী
মার্কেটিং অ্যাডভাইজার, ফাইন গ্রুপ।




























