জাতীয় সরকারই কি মুক্তির উপায়!
চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিই বলে দেয় একটি দেশের অবস্থা সামনে কি হবে বা হতে পারে! ঢাকা দক্ষিণ সিটির মেয়র পদে জনাব ইশরাক হোসেনকে শপথ পাঠ করানো নিয়ে দেশের বৃহত্তম দল বিএনপি ও তাদের কর্মী সমর্থকরা যে আন্দোলন করছে নগর ভবনের প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে, এতে নাগরিক সেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
বিএনপিকে যারা ভালোবাসে বিএনপি’র নেতা, কর্মী, সমর্থকরা অবশ্যই তাদের দলীয় পছন্দকে প্রাধান্য দিবে এবং তাদের ঘোষিত যে কোন আন্দোলনে তারা সক্রিয় অংশগ্রহণ করবেন এটি অত্যন্ত স্বাভাবিক। প্রশ্ন হলো নগর ভবনে কর্মরত কিছু কর্মকর্তা, কর্মচারীও তাদের কাজ বন্ধ রেখে আন্দোলনে শরিক হয়েছে! এটি দোষ বা গুন সে ব্যাপারে আলোচনা না-ই-বা করলাম। কথা হলো সরকারি কর্মচারীরা কি প্রকাশ্যে দলপ্রীতি দেখাতে পারে?
সরকারি কর্মচারীরা তো কোন দলের প্রতিনিধিত্ব করেনা, তারা রাষ্ট্রের কর্মচারী, জনগণের সেবক। যদিও তাদের ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের তালিকায় কোন দল থাকতেই পারে। থাকলেও কোন বাধা নেই, কারণ এটি তার নিজস্ব মত প্রকাশের স্বাধীনতা, নাগরিক অধিকার, মৌলিক অধিকারের আওতায় পড়ে। কিন্তু প্রশ্ন হলো সরকারি কর্মচারী হিসেবে দলীয় কাজে অংশগ্রহণ কতটুকু আইনসিদ্ধ?
আসল ব্যাপার তো তা নয়, চলমান বিভিন্ন কর্মকান্ড দেখে যা বোঝা যাচ্ছে তা হলো, বদলি প্রমোশন ইত্যাদি সুবিধা আদায়ের জন্য আমাদের দেশের সরকারি কর্মচারীরা বিভিন্ন দলে নিজেদেরকে প্রকাশ্যে না হলেও গোপনে যুক্ত রাখেন, যেনো চাকরি জীবনে বিভিন্ন রকমের সুযোগ-সুবিধা দলীয় কারণে পেতে পারেন। এমনটি হলে তো বিশৃঙ্খলা হবেই এবং জন ভোগান্তি অবশ্যই হবে।
চাকুরীকালীন সুবিধাবাদী শ্রেণীর অনৈতিক কর্মকান্ডের সমর্থন আদায়ে এবং আইনি মারপ্যাঁচে পার পাওয়ার জন্য কর্মচারীদের প্রভু প্রয়োজন হয়। তাই তারা প্রভুর সমর্থনে কাজ করে থাকেন। তাদের দলীয় প্রভুকে সমর্থন দিতে গিয়ে তাদের সত্যিকারের মালিক বা প্রভু যে এ দেশের আপামর জনসাধারণ, তাদের প্রতি নিজেদের দায়িত্যের কথা বেমালুম ভুলে যান। ফলে দেশের জনগণের ভোগান্তি মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছে।
যত ধরনের আন্দোলনই হোক না কেন জনগণেরই ভোগান্তি, যদিও জনগণের মধ্যে থেকেই কিছু সংখ্যক লোক এ ধরনের আন্দোলন করে থাকে। ব্যাপারটি এমন যে, যত দোষ নন্দ ঘোষ । বাংলাদেশের জনগণ হলো নন্দ আর সকল দোষ এ জনগণেরই । আবার এ জনগণকে নিয়ে রাজনীতি করেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ক্ষমতার মসনদে গিয়ে দায়িত্ব ভুলে গিয়ে তারা নিজেরা নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
যার জন্যে বিগত দশকের পর দশক আমাদের দেশে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের কর্মকাণ্ডের প্রতি মানুষের মনে এক চরম ঘৃণা তৈরি হয়েছে। এরকম জনতার চরম ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে সম্প্রতি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, আন্দোলন যখন গণঅভ্যুত্থানের রূপ নেয়, তখন বিগত স্বৈরাচারী লুটেরা সরকার সদলবলে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে।
আর এ দেশের মানুষ আন্দোলনও করে জনগণের নিত্যদিনের চলার পথকে আটকে দিয়ে। যেখানে সকল প্রকার যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হয় এবং রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা আবার বুমেরাং হয়ে এ জনসাধারণের ঘাড়েই পড়ে।
হাজারো শহীদের রক্তের বিনিময়ে ম্যান্ডেট নিয়ে যে অন্তর্বর্তী সরকার বর্তমানে ক্ষমতায় আছে, তাদের এতো আন্দোলন সামাল দেয়া সত্যিই অনেক অনেক কঠিন। যতই দিন যাচ্ছে আন্দোলন যেনো বেড়েই চলেছে, থামছে না । আগে বিভিন্ন শ্রেণি-গোষ্ঠী আন্দোলন করতো, এখন দেশের বড় বড় রাজনৈতিক দল আন্দোলনে নেমে পড়েছে। সামনে পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে হবে বলে ধারণা করা যাচ্ছে। তাই চিন্তাশীল নাগরিকেরা চিন্তিত হয়ে পড়েছে এবং সামনে দেশের জন্য কল্যাণকর কি তা ভাবছে। এ ধরনের আন্দোলন মোকাবেলায় সমাধান কি?
আরও পড়ুন <<>> বেশ্যাদের অসভ্য আবেগ প্রকাশে সভ্যতার সর্বনাশ
আমরা হয়তো অনেকেই ভাবছি নির্বাচনই হলো একমাত্র সমাধান। কিন্তু নির্বাচন হয়ে যাওয়ার পর একটি বৃহৎ দল ক্ষমতায় আসলে অনেকেরই ধারণা এমন যে, আবার সে গোষ্ঠীও যদি পলাতক দলের মতো একই আচরণ করে তাহলে দেশের অবস্থা কি দাঁড়াবে? এমতাবস্থায় কোন বিশেষ দলের হাতে তো আমাদের এ মাতৃভূমি নিরাপদ নয়। মাতৃভূমি কে নিরাপদ রাখার জন্য দেশের সব শ্রেণি, গোষ্ঠীর সমন্বয়ে একটি জাতীয় সরকার করলে কেমন হয়?
কয়েকটি সমাধান কল্পনা করা যেতে পারে-
- এক: ডক্টর ইউনুসকে প্রধান রেখে জনসমর্থনের ভিত্তিতে সকল দলের সমন্বয়ে ৩ বছর মেয়াদী জাতীয় সরকার গঠন করে নির্বাচনের রোডম্যাপ দেয়া।
- দুই: নির্বাচনের উদ্দেশ্যে বিএনপির বাহিরে সকল রাজনৈতিক দল ঐক্যবদ্ধ হয়ে একটা প্লাটফর্ম গঠন। তাদের নির্বাচন পরবর্তী সরকার প্রধান হিসেবে একজনকে (ধরুন ড. ইউনুস) নির্ধারণ করে নির্বাচনে যাওয়া।
এমনটি না হলে জনগণের মধ্যে অনেকেরই ভাবনা এমন যে, অন্যথায় বিএনপি এদেশে পুনরায় আওয়ামী লীগে হয়ে উঠবে এবং আওয়ামী লীগের ভাগ্যবরণ করবে।
এ দেশকে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীল করতে জুলাই বিপ্লবের ঐক্যবদ্ধ শক্তির (বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি, গণঅধিকার পার্টি, এবি পার্টিসহ গণঅভ্যুত্থান সপক্ষের সকল দল) সকলকে একসাথে ধরে রাখার মতো করে ভাবতে হবে।
লেখক:
এম এম এ শাহজাহান, প্রকৌশলী
মার্কেটিং অ্যাডভাইজার, ফাইন গ্রুপ।




























